ট্রাম্প গোল্ড কার্ড ভিসা ২০২৫: ধনীদের দ্রুত নাগরিকত্ব

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প চালু করা গোল্ড কার্ড ভিসা ২০২৫– ধনীদের জন্য নতুন অভিবাসন সুযোগ ও দ্রুত নাগরিকত্ব প্রোগ্রাম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘গোল্ড কার্ড’ নামে উচ্চমূল্যের নতুন অভিবাসন ভিসা চালু করেছেন। ধনী বিদেশিদের জন্য তৈরি এই বিশেষ ভিসা যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ উন্মুক্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছেন বহুল আলোচিত ‘গোল্ড কার্ড’ নামের নতুন ভিসা প্রোগ্রাম, যা মূলত বিদেশি ধনী ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এই ভিসা পাওয়ার শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ন্যূনতম এক মিলিয়ন ডলার—যা অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভিসা ব্যবস্থাগুলোর একটি।

ট্রাম্প একে অভিহিত করেছেন “সরাসরি নাগরিকত্বের পথ”, যা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস ও ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী ধনী বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত ভিসা অনুমোদনের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

গোল্ড কার্ড ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও অভিবাসন নীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা নতুন করে জোরালো হয়েছে। প্রোগ্রামটি কতটা সফল হবে কিংবা এটি কাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে—এমন নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সমালোচনা ও বিতর্কও কম হচ্ছে না।

নিচে নতুন এই অভিবাসন নীতি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ, তথ্য, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হলো।

গোল্ড কার্ডের মূল কাঠামো: কারা আবেদন করতে পারবে?

সরকারের প্রকাশিত অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী, গোল্ড কার্ডের জন্য আবেদন করতে হলে আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা দিতে সক্ষম—তা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, ব্যবসায়িক বা উদ্ভাবনী যে খাতেই হোক না কেন।

আরও পড়ুনঃ সাজিদা ফাউন্ডেশন নিয়োগ ২০২৫: ফিল্ড অফিসার পদ

মূল শর্তগুলো হলো—

  • ন্যূনতম বিনিয়োগ: ১ মিলিয়ন ডলার
  • কর্পোরেট বিনিয়োগকারীদের জন্য ফি: সর্বোচ্চ ২ মিলিয়ন ডলার
  • প্রসেসিং ফি: ১৫,000 ডলার (অফেরতযোগ্য)
  • অতিরিক্ত সরকারি চার্জ: আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত
  • নাগরিকত্বের পথ: গ্রিন কার্ডের মতোই দ্রুততর প্রক্রিয়া
  • উচ্চ দক্ষতা, উচ্চ সম্পদ, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা—সবই বিবেচনায় নেওয়া হবে

ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে—গোল্ড কার্ড কোনো সাধারণ ভিসা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে সম্ভাব্য বড় অবদান রাখবে এমন ব্যক্তিদের ‘অগ্রাধিকারভিত্তিক’ প্রবেশাধিকার দেবে।

শিগগিরই আসছে আরও ব্যয়বহুল ‘প্লাটিনাম কার্ড’

গোল্ড কার্ড চালুর পর প্রশাসন জানিয়েছে, তারা খুব শিগগিরই আরও প্রিমিয়াম সংস্করণ—‘প্লাটিনাম কার্ড’ লঞ্চ করতে যাচ্ছে।

প্লাটিনাম কার্ডের প্রস্তাবিত সুবিধা—

  • বিনিয়োগের শর্ত: ৫ মিলিয়ন ডলার
  • বিশেষ কর–সুবিধা
  • প্রিমিয়াম প্রসেসিং
  • অগ্রাধিকারমূলক ব্যবসা অনুমোদন
  • দ্রুত নাগরিকত্বের পথ

অনেকে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন–বিনিয়োগ খাতে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করবে বলে মন্তব্য করছেন।

ট্রাম্পের যুক্তি: “আমরা উৎপাদনশীল মানুষ চাই”

ঘোষণা পর্বে ট্রাম্প বলেন—
“আমরা এমন লোক চাই যারা উৎপাদনশীল, যারা কিছু সৃষ্টি করতে পারে। কেউ যদি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে পারে, তারা নিজেদের কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারে। গোল্ড কার্ড খুব দ্রুত জনপ্রিয় হবে।”

তার ভাষ্যে পরিষ্কার—এই ভিসা শুধু সম্পদশালীদের জন্য নয়, বরং তাদের লক্ষ্য করা হচ্ছে যারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম।

ডেমোক্র্যাটদের কড়া সমালোচনা: ‘ধনীদের অভিবাসন দরজা’

গোল্ড কার্ড ঘোষণার পর থেকেই ডেমোক্র্যাট নেতারা অভিযোগ করছেন—এই ভিসা নীতি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থাকে ‘বৈষম্যমূলক’ করে তুলবে।

তাদের বক্তব্য—

  • সাধারণ দক্ষ কর্মী বা মধ্যবিত্ত বিদেশিদের সুযোগ কমে যাবে
  • ধনীদের জন্য অতি সহজ শর্তে নাগরিকত্বের পথ তৈরি হবে
  • সমান সুযোগের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা রো খান্না বলেন,
“অর্থ থাকলে নাগরিকত্ব—এটাই এখন নতুন নিয়ম হচ্ছে। এটি আমেরিকার অভিবাসন ব্যবস্থার মৌলিক ন্যায়বিচারকে দুর্বল করছে।”

গোল্ড কার্ড কি গ্রিন কার্ডের বিকল্প?

ট্রাম্প দাবি করেছেন—“গোল্ড কার্ড হবে গ্রিন কার্ডের সমতুল্য।”
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে—দুই ভিসার উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন।

গ্রিন কার্ড:

  • সাধারণ অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ
  • চাকরি, পরিবার, শরণার্থীসহ নানা ক্যাটাগরি
  • পাঁচ বছর পর নাগরিকত্বের যোগ্যতা

গোল্ড কার্ড:

  • সরাসরি ধনী ও বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্য করে
  • দ্রুত অনুমোদন
  • উচ্চ ফি ও কঠোর যাচাই
  • নাগরিকত্বের পথ দ্রুততর হতে পারে

অভিবাসন বিশ্লেষকেরা বলছেন—“গোল্ড কার্ড মূলত এক ধরনের ‘প্রিমিয়াম গ্রিন কার্ড’। ধনীদের জন্য নাগরিকত্বের শর্টকাট পথ।”

কঠোর অভিবাসন নীতির মধ্যেই নতুন প্রোগ্রাম চালু

ট্রাম্প যখন এই ব্যয়বহুল অভিবাসন পথ খুলছেন, ঠিক সেই সময়েই নিয়েছেন একাধিক কঠোর অভিবাসন সিদ্ধান্ত—

  • এইচ–১বি ভিসার ফি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ ডলার
  • ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ১৯ দেশের নাগরিকদের আবেদন স্থগিত
  • অননুমোদিত অভিবাসীদের আটক ও প্রত্যর্পণ আরও কঠোর

এই পরিস্থিতিতে গোল্ড কার্ডকে অনেকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘প্রতিবন্ধ–বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা’ হিসেবেই দেখছেন।

এইচ–১বি ভিসার চাপ কমে গেছে

২০২৫ অর্থবছরে এইচ–১বি আবেদনের সংখ্যা নেমে এসেছে ৩ লাখ ৫৯ হাজারে, যা গত ৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
কারণ—

  • কঠোর যাচাই
  • অনিশ্চিত নীতি
  • ফি বৃদ্ধি
  • নতুন অভিবাসন ঝুঁকি

এই পরিস্থিতিতে গোল্ড কার্ড অনেক বিদেশির কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে—যারা দক্ষ কর্মী ভিসার অপেক্ষায় বছরের পর বছর ধরে ছিলেন।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব: ট্রাম্পের বড় লক্ষ্য

ট্রাম্পের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে—
“যদি সরকার ১ কোটি গোল্ড কার্ড বিক্রি করতে পারে, বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।”

যদিও অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে—

  • ১ কোটি গোল্ড কার্ড বিক্রির সম্ভাবনা বাস্তবে নেই
  • এর লক্ষ্য হলো উচ্চ মূল্যের ভিসার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ
  • বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাষ্ট্রে টেনে আনা
  • স্টার্টআপ, গবেষণা এবং প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো

এই কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—গোল্ড কার্ড যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিতে পারে, তবে এটি ধনী–গরিবের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে তুলবে।

বাছাই প্রক্রিয়া: এখনও অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত

যদিও গোল্ড কার্ড ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু এখনো জানা যায়নি—

  • আবেদনকারীদের যাচাই কীভাবে হবে
  • কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে
  • আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের পদ্ধতি কী
  • নাগরিকত্বের নির্দিষ্ট সময়সীমা কত
  • কতজনকে এই ভিসা দেওয়া হবে

অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন—“প্রোগ্রামটি কার্যকর হতে হলে স্বচ্ছতা ও স্পষ্ট নির্দেশিকা অত্যন্ত জরুরি।”

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে

বিশ্বের অনেক দেশ আগেই উচ্চ বিনিয়োগে নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দিয়ে থাকে—

  • কানাডা
  • যুক্তরাজ্য
  • অস্ট্রেলিয়া
  • মাল্টা
  • পর্তুগাল

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতদিন এই ধরনের ‘বিনিয়োগ–ভিত্তিক দ্রুত নাগরিকত্ব পথে’ সরাসরি নামেনি।
গোল্ড কার্ড চালুর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এখন বৈশ্বিক এই প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করলো।

সমর্থন ও সমালোচনার মাঝেই এগোচ্ছে গোল্ড কার্ড

গোল্ড কার্ড শেষ পর্যন্ত কতটা জনপ্রিয় হবে তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে বর্তমানে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে—

সমর্থনকারীরা বলছেন—

  • যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে
  • প্রযুক্তি ও গবেষণা খাত শক্তিশালী হবে
  • বিশ্বমানের প্রতিভা যুক্তরাষ্ট্রে আসবে
  • অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে

সমালোচকেরা বলছেন—

  • সাধারণ অভিবাসীরা উপেক্ষিত হবে
  • বৈষম্য বাড়বে
  • নাগরিকত্ব ‘বিক্রির’ সংস্কৃতি তৈরি হবে
  • অভিবাসন নীতি রাজনৈতিকভাবে বিভাজন তৈরি করবে

ট্রাম্পের গোল্ড কার্ড যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের নতুন অধ্যায়

গোল্ড কার্ড শুধু একটি ভিসা নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ধানচাষে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
ধনী বিনিয়োগকারীদের জন্য অভিবাসনের দ্রুত পথ খুলে গেলেও এটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক সমতা ও অভিবাসন সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলবে—তা এখনো পরিষ্কার নয়।

তবে একথা নিশ্চিত—
এই ভিসা প্রোগ্রাম যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও বড় বিতর্ক, সম্ভাবনা ও নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা করবে।

Leave a Comment