
ইউরোপ ভ্রমণের স্বপ্ন দেখেন এমন ভ্রমণপিপাসু, শিক্ষার্থী কিংবা ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত ভিসাগুলোর একটি হলো শেনজেন ভিসা। একটিমাত্র ভিসার মাধ্যমে ইউরোপের একাধিক দেশে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ থাকায় প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মানুষ এই ভিসার জন্য আবেদন করেন। তবে আবেদন সংখ্যার বিপরীতে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও কম নয়। সামান্য ভুল, অস্পষ্ট তথ্য কিংবা নথিপত্রের ঘাটতির কারণেই অনেক আবেদন বাতিল হয়ে যায়।
এই প্রতিবেদনে শেনজেন ভিসা কী, কোন কোন দেশ এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত, ভিসার ধরন, ফি কাঠামো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে শেনজেন ভিসা বাতিল হওয়ার প্রধান ১০টি কারণ ও তা এড়ানোর বাস্তবসম্মত উপায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
শেনজেন ভিসা কী?
শেনজেন ভিসা (Schengen Visa) হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বিশেষ স্বল্পমেয়াদি ভিসা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো ভ্রমণকারী শেনজেন চুক্তিভুক্ত দেশগুলোতে একবার প্রবেশ করলে আলাদা আলাদা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণ করতে পারেন।
সহজভাবে বলা যায়, শেনজেন অঞ্চলটি ইউরোপের এমন একটি মুক্ত চলাচল এলাকা, যেখানে অভ্যন্তরীণ সীমান্ত কার্যত বিলুপ্ত। ফলে একটি শেনজেন ভিসা থাকলেই ভ্রমণকারীরা একই সফরে একাধিক ইউরোপীয় দেশ ঘুরে দেখার সুযোগ পান।
আরও পড়ুনঃ অনলাইনে শূন্য আয়কর (Zero Return) জমা দেওয়ার সহজ নিয়ম
শেনজেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহ
বর্তমানে ইউরোপের মোট ২৭টি দেশ শেনজেন চুক্তির আওতায় রয়েছে। দেশগুলো হলো—
অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিক, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ইতালি, লাতভিয়া, লিচেনস্টাইন, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন এবং সুইজারল্যান্ড।
এই দেশগুলোর যেকোনো একটিতে প্রবেশ করলেই বাকি দেশগুলোতে যাতায়াত করা যায়, যদি ভিসার মেয়াদ ও শর্ত সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়।
শেনজেন ভিসার ধরন
শেনজেন ভিসা মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে—
১. শর্ট-স্টে ভিসা (C টাইপ)
এই ভিসার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত শেনজেন অঞ্চলে অবস্থান করা যায়। সাধারণত এই ভিসা দেওয়া হয়—
- পর্যটন ভ্রমণ
- ব্যবসায়িক সফর
- আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা
- স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ বা সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য
২. লং-স্টে ভিসা (D টাইপ)
যারা ৯০ দিনের বেশি সময় ইউরোপে থাকতে চান, তাদের জন্য এই ভিসা প্রযোজ্য। যেমন—
- উচ্চশিক্ষা
- চাকরি
- গবেষণা
- দীর্ঘমেয়াদি বসবাস
শেনজেন ভিসার ফি কাঠামো
বর্তমানে শেনজেন ভিসার সরকারি ফি সাধারণত নিম্নরূপ—
- প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য: ৮০ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০,০০০ টাকা)
- ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য: ৪০ ইউরো (প্রায় ৫,০০০ টাকা)
- ৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য: কোনো ফি নেই
তবে ভিসা সেন্টার ফি বা সার্ভিস চার্জ আলাদাভাবে যোগ হতে পারে।
শেনজেন ভিসা বাতিল হয় কেন?
শেনজেন ভিসা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিসাগুলোর একটি হলেও এর অনুমোদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০১৭ সালেই ১৭ লাখের বেশি শেনজেন ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবেদন বাতিল হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা বাতিলের পেছনে সাধারণত আবেদনকারীর অসতর্কতা, তথ্যের অসামঞ্জস্য এবং নথিপত্রের ঘাটতিই প্রধান ভূমিকা রাখে।
নিচে শেনজেন ভিসা বাতিলের ১০টি সবচেয়ে সাধারণ কারণ ও তা এড়ানোর কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো—
১. জাল বা ভুয়া নথিপত্র জমা
নকল পাসপোর্ট, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, মিথ্যা চাকরির সনদ কিংবা সাজানো আমন্ত্রণপত্র জমা দিলে ভিসা আবেদন সরাসরি বাতিল হয়ে যায়। এমনকি ভবিষ্যতের আবেদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সমাধান:
সব সময় যাচাইযোগ্য, অফিসিয়াল ও সত্য নথিপত্র জমা দিন। কোনো তথ্য নিয়ে সংশয় থাকলে তা গোপন না করে ব্যাখ্যা সংযুক্ত করুন।
২. ভ্রমণের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট হওয়া
শুধু ‘ট্যুরিজম’ বা ‘বিজনেস’ লিখে আবেদন করলে অনেক সময় কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয় না।
সমাধান:
স্পষ্ট ট্রাভেল প্ল্যান, হোটেল বুকিং, যাতায়াতের তথ্য এবং দিনভিত্তিক সফরসূচি সংযুক্ত করুন।
৩. আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি
ব্যাংক ব্যালেন্স কম থাকা বা আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্য থাকলে আবেদন সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।
সমাধান:
কমপক্ষে শেষ ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বেতন স্লিপ, আয়কর নথি ও সঞ্চয়ের প্রমাণ দিন।
৪. অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থানের ইতিহাস
আগে শেনজেন এলাকায় ৯০ দিনের বেশি অবস্থান করলে তা ভবিষ্যৎ আবেদনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সমাধান:
Schengen Stay Calculator ব্যবহার করে সফরের দিনসংখ্যা সঠিকভাবে পরিকল্পনা করুন।
৫. এসআইএস (SIS) ডাটাবেজে নাম থাকা
ভিসা আইন লঙ্ঘন, বহিষ্কার বা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আবেদনকারীর নাম SIS ডাটাবেজে থাকলে ভিসা বাতিল হয়।
সমাধান:
পুরোনো অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতা আগে সমাধান করে নিন।
আরও পড়ুনঃ ট্রাম্প গোল্ড কার্ড ভিসা ২০২৫: ধনীদের দ্রুত নাগরিকত্ব
৬. জননিরাপত্তা বা স্বাস্থ্য ঝুঁকি
অপরাধমূলক রেকর্ড বা গুরুতর সংক্রামক রোগ থাকলে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।
সমাধান:
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সনদ জমা দিন।
৭. বৈধ স্বাস্থ্যবীমার অভাব
শেনজেন ভিসার জন্য কমপক্ষে ৩০,০০০ ইউরো কভারেজ-সহ স্বাস্থ্যবীমা বাধ্যতামূলক।
সমাধান:
সম্পূর্ণ ভ্রমণকালজুড়ে কার্যকর ও অনুমোদিত স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করুন।
৮. তথ্যের অসামঞ্জস্য
ফর্ম ও নথিতে একই বিষয়ের ভিন্ন তথ্য থাকলে আবেদন বাতিল হয়।
সমাধান:
আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য একাধিকবার যাচাই করুন।
৯. দেশে ফেরার পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকা
নিজ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল মনে হলে কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করে।
সমাধান:
চাকরি, ব্যবসা, পরিবার, সম্পত্তি ও সামাজিক বন্ধনের প্রমাণ সংযুক্ত করুন।
১০. জরুরি ভিসার জন্য যথাযথ কারণ না দেখানো
চিকিৎসা বা মানবিক কারণে জরুরি ভিসার আবেদন করলে শক্ত প্রমাণ প্রয়োজন হয়।
সমাধান:
হাসপাতালের কাগজপত্র, অফিসিয়াল চিঠি বা সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংযুক্ত করুন।
শেনজেন ভিসা পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সঠিক প্রস্তুতি, সত্য তথ্য ও সম্পূর্ণ নথিপত্রই পারে আপনার ইউরোপ ভ্রমণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে। অভিজ্ঞদের মতে, ভিসা আবেদনকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের বহু সুযোগ নষ্ট করে দিতে পারে।
সচেতনতা, সততা এবং পরিকল্পিত আবেদনই শেনজেন ভিসা পাওয়ার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।