ওসমান হাদির অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন, ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে চিকিৎসকরা

এভারকেয়ার হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি
গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি

ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ আপডেট জানাল ইনকিলাব মঞ্চ

রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে এখনো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় একদিন পার হলেও তার শারীরিক অবস্থা এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টা তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শনিবার (১২ ডিসেম্বর) সকালে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ওসমান হাদি এখনো আশঙ্কামুক্ত নন। এই সময়ের আগে ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা উন্নতি বা অবনতির বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

এভারকেয়ার হাসপাতালে কড়া পর্যবেক্ষণ

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন ওসমান হাদি। সকাল সোয়া ১০টার দিকে হাসপাতাল চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। তিনি বলেন, “ওসমান হাদির শরীরে ইন্টারনাল রেসপন্স রয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে চিকিৎসকেরা এখনও তাকে ঝুঁকিমুক্ত ঘোষণা করেননি।”

চিকিৎসকরা তাকে ৪৮ ঘণ্টার ক্লোজ অবজারভেশনে রেখেছেন বলে জানান তিনি। এই সময়ের মধ্যে তার নিউরোলজিক্যাল কন্ডিশন, রক্তক্ষরণ পরিস্থিতি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর আগে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চিকিৎসকেরা অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

আবদুল্লাহ আল জাবের আরও জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই তিনি হাসপাতালে অবস্থান করছেন এবং দলের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে ওসমান হাদির দ্রুত আরোগ্য কামনায় দোয়া চেয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি – তফসিল ঘোষণা

হাসপাতাল চত্বরে নেতাকর্মীদের ভিড়

শনিবার সকাল থেকেই এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। ইনকিলাব মঞ্চ ছাড়াও ‘মঞ্চ–২৪’সহ একাধিক সংগঠনের কর্মীরা হাসপাতালে এসে ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দেন মঞ্চ–২৪ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী। তিনি বলেন, “এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি সুপরিকল্পিত।” তার দাবি, বিভিন্ন সূত্র ও প্রাপ্ত তথ্যে হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ

ফাহিম ফারুকী অভিযোগ করেন, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হামলার সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কিছু সদস্য জড়িত থাকতে পারে। তিনি বলেন, “সরকার অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তারা সবাই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের কারণে ধারাবাহিকভাবে হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একই সঙ্গে তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

ঢাকা মেডিকেল থেকে এভারকেয়ারে স্থানান্তর

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রথমে ওসমান হাদিকে রিকশায় করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গুলি তার মাথায় লেগেছিল এবং তখন তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ওইদিন বিকেলে জানান, একটি গুলি ওসমান হাদির কানের ডান পাশ দিয়ে প্রবেশ করে মাথার বাঁ পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এই ঘটনায় তার মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লাগে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় তাকে দ্রুত লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসকেরা জরুরি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় রাতেই তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

চিকিৎসকদের মূল্যায়ন

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ায় নিউরোলজিক্যাল জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, স্নায়ুর ক্ষতি এবং পরবর্তী সংক্রমণ—এই তিনটি বিষয় বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

এভারকেয়ার হাসপাতালের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রোগীর ভিটাল সাইনস আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখনই তাকে ঝুঁকিমুক্ত বলা যাচ্ছে না। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় তার শারীরিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই একজন সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

বিভিন্ন দল পৃথক বিবৃতিতে অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নির্বাচনের আগে সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই ধরনের সহিংস ঘটনা আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা শঙ্কা

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকেরা। একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর ওপর প্রকাশ্য গুলিবর্ষণের ঘটনা নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা রোধে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া হলে নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে আতঙ্ক আরও বাড়তে পারে।

ঘটনার পটভূমি

প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন শুক্রবার দুপুরে রাজধানীতে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার শেষে রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনার পর থেকে তার শারীরিক অবস্থা ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন থাকলেও চিকিৎসকেরা আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি বলে জানিয়েছেন। আগামী দুই দিন তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এদিকে এই হামলা ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় এবং আহত নেতার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয় কি না—সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।

Leave a Comment