
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, একই দিনে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তও জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এ তফসিল ঘোষণা করেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ—এ কথা তুলে ধরেন তিনি।
ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনী উত্তাপ আরও বেড়ে গেছে। ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। এর আগে বুধবার (১০ ডিসেম্বর) নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তফসিল ও নির্বাচনী প্রস্তুতি সংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করেন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ।
স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ও আগের চেয়ে শক্তিশালী ইসি—সিইসির বক্তব্যে গুরুত্ব
জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই হালনাগাদ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এবারকার ভোটার তালিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও স্বচ্ছ, ত্রুটিমুক্ত ও নির্ভরযোগ্য।
তিনি বলেন—
“নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা আগের বৈশিষ্ট্য ভেঙে এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আচরণবিধিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তন রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের পরামর্শে সম্পন্ন করা হয়েছে। নির্বাচনকে সর্বজনীন, অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আমাদের চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে।”
ইসি সূত্রে জানা যায়, এবার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য মিলিয়ে অনিয়মের সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি, বায়োমেট্রিক যাচাই ও ডিজিটাল ভোটার ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ সাজিদা ফাউন্ডেশন নিয়োগ ২০২৫: ফিল্ড অফিসার পদ
গণভোটের তফসিলও একই দিনে ঘোষণা — জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ
সিইসির ঘোষণায় এও জানানো হয় যে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে জনগণের সরাসরি মতামত জানতেই একই দিনে গণভোট গ্রহণ করা হবে।
এ প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে—যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে একটি বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হলেও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
গণভোটের প্রশ্ন ও নির্দেশনাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত আগামী সপ্তাহে জানানো হবে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে নীতি-নির্ধারণে জনগণের মতামতকে সরাসরি মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
মিডিয়ায় সরাসরি সম্প্রচার: বিটিভি ও বেতারের মাধ্যমে তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছায়
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিইসির ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনো ঘোষণা, নির্দেশনা ও তফসিল জনগণের কাছে সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও দ্রুতভাবে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ প্রচার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং রেডিও স্টেশনসমূহ বিটিভির সরাসরি সম্প্রচারের সিগন্যাল রিলে করে তফসিল ঘোষণা লাইভ প্রচার করে। ফলে ঘোষণার মুহূর্তেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুনঃ বেপজা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০২৫: মেডিকেল অফিসার ও ইলেকট্রো মেডিকেল টেকনিশিয়ান পদে আবেদন শুরু
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পোস্টার-ব্যানার অপসারণের নির্দেশ—কঠোর আচরণবিধির প্রয়োগ
তফসিল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই রাতে নির্বাচন কমিশন একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে বলা হয়—
🔹 তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের সব রাজনৈতিক দল, সম্ভাব্য প্রার্থী ও সমর্থকদের পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ডসহ সব নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী অপসারণ করতে হবে।
🔹 এ নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ইসি।
নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগের অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ে পুলিশ, র্যাব, জেলা নির্বাচন অফিস, ম্যাজিস্ট্রেট নেতৃত্বাধীন নির্বাহী টিমসহ সব সংস্থাকে এ নির্দেশনার বাস্তবায়নে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে।
ইসির বক্তব্য—
“অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সমান পরিবেশ গঠন জরুরি। তফসিল ঘোষণার পর পূর্বনির্ধারিত প্রচারসামগ্রী মাঠে থাকা যাবে না।”
রাষ্ট্রপতির আশ্বাস: ‘নির্বাচন হবে স্বাধীন, শান্তিপূর্ণ, নির্ভুল’
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়সহ রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে সহায়তা করবে।
রাষ্ট্রপতির মতে—
“একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতির প্রত্যাশা। নির্বাচন কমিশন যেন বাধাহীনভাবে কাজ করতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোও এ আশ্বাসকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাদের ধারণা, রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয় ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা সামনে বড় ভূমিকা রাখবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় — জোট করলেও প্রতীক থাকবে নিজস্ব
তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রার্থী তালিকা, জোট-সমঝোতা, নির্বাচনী কৌশল এবং প্রচারণা পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করবে।
ইতোমধ্যে ইসি স্পষ্ট করেছে—
🔸 যে দলই জোট করুক না কেন, প্রতিটি দলকে নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে।
🔸 জোট বা ঐক্যের ঘোষণা প্রচারণায় উল্লেখ করা যাবে, তবে প্রতীক একীভূত হবে না।
এ ঘোষণায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এতে নির্বাচনের মাঠ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে এবং ভোটারের সামনে দলভেদে পরিষ্কার পরিচয় স্পষ্ট থাকবে।
প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি
তফসিল ঘোষণার পরপরই মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ে প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছে।
ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী—
- ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা হালনাগাদ করা
- ইভিএম বা ব্যালট যেভাবেই ভোট হোক, তার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা
- প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময়সূচি নির্ধারণ
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ফোর্স মোতায়েন পরিকল্পনা তৈরি
- নির্বাচন পর্যবেক্ষক নিবন্ধন প্রক্রিয়া সক্রিয় করা
- ভোটার শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা
সব জেলা নির্বাচন অফিসে ইতোমধ্যে সমন্বয় সভা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভোটারদের প্রত্যাশা—নিরাপদ পরিবেশে ভোট দিতে চান সবাই
তফসিল ঘোষণার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, সিলেট ও রংপুর অঞ্চলের ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকে নির্বাচনকে গণতন্ত্রের বড় উৎসব হিসেবে দেখছেন; আবার কেউ কেউ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতের ওপর জোর দিচ্ছেন।
ভোটারদের মতে—
- যে দলই ক্ষমতায় আসুক, মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়া চাই।
- ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদে ভোট দিতে চান সবাই।
- নির্বাচনে প্রতিযোগিতা থাকলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।
তরুণ ভোটাররা বিশেষভাবে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার প্রত্যাশা করছেন।
বিশ্লেষকদের মত—গণভোট এক নতুন দিগন্ত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন প্রশাসন ও কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে জনঅংশগ্রহণের নতুন পথ খুলে দেবে।
তাদের ভাষ্য—
- গণভোটের প্রশ্ন সাধারণ মানুষের বাস্তব মতামত প্রকাশ করবে।
- নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াবে।
- আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ উদ্যোগ গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার একটি ইতিবাচক নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
পরবর্তী সময়সূচি—মনোনয়ন থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত ধাপে ধাপে কার্যক্রম
ইসি সূত্র জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত বিস্তারিত সময়সূচি প্রকাশ করা হবে। তার মধ্যে থাকবে—
- মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ
- যাচাই-বাছাই ও মনোনয়ন বাতিলের কারণ
- আপিল দাখিলের সময়সীমা
- প্রতীক বরাদ্দ
- নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর তারিখ
- ভোট গ্রহণ, গণনা ও ফলাফল ঘোষণার নিয়ম
সময়সূচির বেশিরভাগ ধাপই আগের নির্বাচনের মতোই হবে বলে কমিশন জানিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী উত্তাপে প্রবেশ করেছে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনকে সামনে রেখে—
- স্বচ্ছ ভোটার তালিকা
- হালনাগাদ আচরণবিধি
- প্রশাসনিক প্রস্তুতি
- রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তা
- জনগণের প্রত্যাশা
- রাষ্ট্রপতির সহযোগিতার আশ্বাস
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এখন অপেক্ষা—আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক উত্তাপ, প্রচারযুদ্ধ এবং সর্বোপরি ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের।