
দেশের স্বর্ণ ও রুপার বাজারে আবারও মূল্য সমন্বয়ের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) থেকে দেশের বাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণ সর্বোচ্চ ২ লাখ ১৭ হাজার টাকার বেশি দরে বিক্রি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য পরিবর্তন, ডলার বিনিময় হার এবং স্থানীয় বাজারে কাঁচামালের দামের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এই নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় বাজুসের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট ও সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রুপার দামও একযোগে বাড়ানো হয়েছে, যা দেশের গয়না শিল্প ও ক্রেতা সাধারণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুনঃ ৯ কোটি ২০ লাখে কলকাতায় মোস্তাফিজ | IPL নিলাম
২২ ক্যারেট স্বর্ণের নতুন দাম
বাজুস ঘোষিত নতুন দর অনুযায়ী, দেশের বাজারে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ধাতু হিসেবে পরিচিত ২২ ক্যারেট স্বর্ণের এক ভরি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৭ টাকা। আগের দরের তুলনায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। সাধারণত বিয়ের মৌসুম, উৎসবকাল কিংবা বিনিয়োগের চাহিদা বাড়লে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের চাহিদা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। ফলে দামের এই ঊর্ধ্বগতি বাজারে স্বর্ণ কেনাবেচার ওপর প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যান্য ক্যারেটের স্বর্ণের মূল্য তালিকা
শুধু ২২ ক্যারেট নয়, অন্যান্য ক্যারেটের স্বর্ণের দামও সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন তালিকা অনুযায়ী—
- ২১ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি বিক্রি হবে ২ লাখ ৭ হাজার ২১১ টাকা
- ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ টাকা
- সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের প্রতি ভরি বিক্রি হবে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা
বাজুস জানিয়েছে, এই দামগুলো কেবল স্বর্ণের মূল দাম। এর সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ভ্যাট ও বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি যুক্ত হবে।
ভ্যাট ও মজুরি: ক্রেতাদের জন্য বাড়তি হিসাব
স্বর্ণ কিনতে গেলে শুধু ঘোষিত মূল দামই নয়, বাড়তি কিছু খরচও বহন করতে হয়। বাজুসের নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বর্ণের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ৫ শতাংশ সরকারি ভ্যাট বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করা হবে, যা গয়না তৈরির শ্রমমূল্য হিসেবে ধরা হয়।
তবে বাজুস জানিয়েছে, গয়নার ডিজাইন, নকশা ও মানভেদে মজুরির হার ভিন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, সাধারণ ডিজাইনের গয়নার ক্ষেত্রে মজুরি কম হলেও জটিল ও ভারী নকশার গয়নায় মজুরি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এতে করে শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকে ঘোষিত দামের চেয়ে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। স্বর্ণ রুপার আজকের দাম
আগের মূল্য সমন্বয়ের ইতিহাস
স্বর্ণের দামের এই নতুন ঘোষণা হঠাৎ আসেনি। এর আগেও চলতি মাসে বাজারে একাধিকবার মূল্য সমন্বয় করেছে বাজুস। সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সেদিন প্রতি ভরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৫ টাকা।
সে সময় অন্যান্য ক্যারেটের দাম ছিল—
- ২১ ক্যারেট: ২ লাখ ২ হাজার ৪৯৯ টাকা
- ১৮ ক্যারেট: ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭২ টাকা
- সনাতন পদ্ধতি: ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪২৪ টাকা
এই দরগুলো ১২ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও দাম বাড়ানোয় বাজারে আলোচনা ও সমালোচনা দুটোই চলছে।
কেন বাড়ছে স্বর্ণের দাম?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে যখন অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে চাহিদা বাড়ে এবং দামও বাড়তে থাকে। এর প্রভাব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
রুপার দামও ঊর্ধ্বমুখী
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও বাড়িয়েছে বাজুস। সর্বশেষ সমন্বয়ে প্রতি ভরিতে ৩২৬ টাকা বাড়ানো হয়েছে রুপার দাম। বর্তমানে বাজারে—
- ২২ ক্যারেট রুপা: প্রতি ভরি ৪ হাজার ৫৭২ টাকা
- ২১ ক্যারেট রুপা: প্রতি ভরি ৪ হাজার ৩৬২ টাকা
- ১৮ ক্যারেট রুপা: প্রতি ভরি ৩ হাজার ৭৩২ টাকা
- সনাতন পদ্ধতির রুপা: প্রতি ভরি ২ হাজার ৭৯৯ টাকা
রুপা সাধারণত স্বর্ণের তুলনায় কম দামের হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। তবে দাম বাড়ায় এই বাজারেও কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রুপার দামের ওঠানামা: পরিসংখ্যান কী বলছে
চলতি বছর এখন পর্যন্ত রুপার দাম ১০ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ বার দাম বেড়েছে, আর ৩ বার কমেছে। বিপরীতে, গত বছর রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল মাত্র ৩ বার। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে চলতি বছরে ধাতব বাজারে অস্থিরতা তুলনামূলক বেশি।
ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়লে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি কিছুটা কমে যায়। বিশেষ করে সাধারণ ক্রেতারা দাম স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষা করেন। তবে বিয়ের মৌসুম বা উৎসবকে সামনে রেখে অনেকেই বাধ্য হয়েই স্বর্ণ কিনে থাকেন।
অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, বারবার দাম বাড়ায় স্বর্ণ কেনা এখন আগের মতো সহজ নয়। অনেকেই গয়নার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন বা বিকল্প হিসেবে রুপার দিকে ঝুঁকছেন।
সামনে কী হতে পারে?
বাজার সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি স্বর্ণের দাম স্থিতিশীল না হয়, তাহলে আগামী দিনগুলোতেও স্থানীয় বাজারে আরও সমন্বয় আসতে পারে। একই সঙ্গে ডলার–টাকা বিনিময় হার ও আমদানি নীতির ওপরও দামের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের স্বর্ণ ও রুপার বাজার আবারও মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়েছে। ভরিতে ২ লাখ ১৭ হাজার টাকার ঘর ছোঁয়া স্বর্ণের দাম সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই সঙ্গে রুপার দাম বাড়ায় বিকল্প ধাতু হিসেবেও চাপ তৈরি হয়েছে। বাজারের এই পরিস্থিতিতে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই এখন সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে, আর ভবিষ্যৎ দামের দিকে তাকিয়ে রয়েছে পুরো গয়না শিল্প।
বাজুসের স্বর্ণ রুপার আজকের দাম
নিচে স্বর্ণ রুপার আজকের দাম দেওয়া হলো—
স্বর্ণের আজকের বাজারদর (বাজুস ঘোষিত)
| ক্যারেট | প্রতি ভরি দাম (টাকা) |
|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ২,১৭,০৬৭ |
| ২১ ক্যারেট | ২,০৭,২১১ |
| ১৮ ক্যারেট | ১,৭৭,৬৪৩ |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৪৭,৯০০ |
নোট: উপরোক্ত দামের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫% ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬% মজুরি যুক্ত হবে। গয়নার নকশা ও মানভেদে মজুরি পরিবর্তিত হতে পারে।
রুপার আজকের বাজারদর
| ক্যারেট | প্রতি ভরি দাম (টাকা) |
|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ৪,৫৭২ |
| ২১ ক্যারেট | ৪,৩৬২ |
| ১৮ ক্যারেট | ৩,৭৩২ |
| সনাতন পদ্ধতি | ২,৭৯৯ |
সাম্প্রতিক মূল্য পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত চিত্র
| ধাতু | সর্বশেষ সমন্বয় | দাম পরিবর্তন |
|---|---|---|
| স্বর্ণ (২২ ক্যারেট) | ১৬ ডিসেম্বর | বৃদ্ধি |
| রুপা (২২ ক্যারেট) | ১৬ ডিসেম্বর | ভরিতে +৩২৬ টাকা |