বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ২০২৫–২৬: গুচ্ছ ভর্তি তিন লাখ

১৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় ইউনিটভিত্তিক আবেদনসংখ্যা
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে জিএসটি গুচ্ছভুক্ত ১৯ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে আবেদন করেছেন প্রায় পৌনে তিন লাখ শিক্ষার্থী

দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে জিএসটি (GST) গুচ্ছভুক্ত ১৯টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তির জন্য আবেদন করেছেন প্রায় পৌনে তিন লাখ শিক্ষার্থী। আবেদনসংখ্যার এই পরিসংখ্যান একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার আগ্রহকে তুলে ধরে, অন্যদিকে তীব্র প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্রও স্পষ্ট করে।

মোট আবেদন: সংখ্যায় ও তাৎপর্যে

জিএসটি গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি পরীক্ষার কোর কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে মোট আবেদন জমা পড়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫৪টি। এই বিপুল সংখ্যক আবেদন প্রমাণ করে, দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীদের নির্ভরতা ও আস্থার জায়গাটি এখনও অটুট রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও তুলনামূলক কম খরচ, একাডেমিক মান ও সরকারি স্বীকৃতির কারণে গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই ভিড় বেশি থাকে।

তথ্য নিশ্চিত করলেন কোর কমিটির সচিব

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টার দিকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন জিএসটি গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি পরীক্ষার কোর কমিটির (২০২৫–২৬) সচিব এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক। তিনি জানান, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং সার্বিকভাবে আবেদন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ ২০২৬ সালে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ছুটি ৬৪ দিন, প্রকাশিত পূর্ণ ছুটি তালিকা

ইউনিটভিত্তিক আবেদন পরিসংখ্যান

চলতি বছরও ইউনিটভিত্তিক আবেদনে বড় ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি, যা সংখ্যার দিক থেকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে।

  • ‘এ’ ইউনিট (বিজ্ঞান): ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৯ জন
  • ‘বি’ ইউনিট (মানবিক): ৯০ হাজার ৪০৪ জন
  • ‘সি’ ইউনিট (ব্যবসায় শিক্ষা): ২৩ হাজার ৯৬১ জন

এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট আবেদনকারীর অর্ধেকেরও বেশি বিজ্ঞান ইউনিটে। মানবিক ইউনিটে আবেদন তুলনামূলক কম হলেও সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্য। ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে আবেদন সবচেয়ে কম, যা প্রতি বছরই প্রায় একই প্রবণতা অনুসরণ করে।

কেন বিজ্ঞান ইউনিটে আবেদন বেশি?

শিক্ষাবিদদের মতে, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয় ও ক্যারিয়ার অপশন তুলনামূলক বেশি। প্রকৌশল, প্রযুক্তি, আইটি, ফার্মেসি, পরিসংখ্যান, গণিতসহ নানা বিষয়ের সুযোগ থাকায় বিজ্ঞান ইউনিটে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়।

অন্যদিকে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে বিষয় সংখ্যা সীমিত হওয়ায় আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে।

আবেদন প্রক্রিয়ার সময়সূচি

জিএসটি গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় গত ৭ ডিসেম্বর। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হয় প্রস্তুতির ব্যস্ততা।

  • আবেদন শুরু: ১০ ডিসেম্বর
  • আবেদন শেষ: ৩০ ডিসেম্বর (রাত পর্যন্ত)

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবার আবেদন প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো কারিগরি জটিলতা দেখা যায়নি, যা আগের বছরের তুলনায় ইতিবাচক দিক।

কারা আবেদন করতে পেরেছেন?

ভর্তি বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, এবার আবেদন করার সুযোগ পেয়েছেন—

  • ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালের এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা
  • ২০২৪ ও ২০২৫ সালের এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা

এই বিস্তৃত সময়সীমার কারণে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী আবেদন করার সুযোগ পেয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি

ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচিও ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। পরীক্ষাগুলো ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে—

  • ‘সি’ ইউনিট (ব্যবসায় শিক্ষা): ২৭ মার্চ
  • ‘বি’ ইউনিট (মানবিক): ৩ এপ্রিল
  • ‘এ’ ইউনিট (বিজ্ঞান): ১০ এপ্রিল

পরীক্ষার এই ব্যবধান শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পাস নম্বর

এবারের ভর্তি পরীক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে—

  • ন্যূনতম পাস নম্বর: ৩০
  • প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য: ০.২৫ নম্বর কাটা যাবে

এই নেগেটিভ মার্কিং পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীদের সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্দাজে উত্তর দেওয়ার প্রবণতা কমাতে এই নিয়ম কার্যকর ভূমিকা রাখে।

দ্বিতীয়বার আবেদন করার সুযোগ

শিক্ষার্থীদের জন্য এবারও সেকেন্ড টাইম আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যারা আগের বছর আবেদন করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আবার আবেদন করতে পেরেছেন। এতে অনেক শিক্ষার্থী নতুন করে আশা নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

আসনসংকট ও প্রতিযোগিতার বাস্তবতা

যদিও আবেদনকারী প্রায় তিন লাখের কাছাকাছি, তবে গুচ্ছভুক্ত ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসন সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে প্রতি আসনের বিপরীতে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র হবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

বিশেষ করে বিজ্ঞান ইউনিটে একটি আসনের জন্য একাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গুচ্ছ পদ্ধতির সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ

গুচ্ছ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—

  • একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একবারেই পরীক্ষা
  • সময় ও অর্থ সাশ্রয়
  • ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা

তবে একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পরীক্ষার দিনসূচি, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও ফল প্রকাশে সামান্য বিলম্ব হলেও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বেড়ে যায়। তাই কর্তৃপক্ষের দক্ষ ব্যবস্থাপনাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির পরামর্শ

বিশেষজ্ঞরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলছেন—

  • ইউনিটভিত্তিক সিলেবাস ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে
  • নেগেটিভ মার্কিং মাথায় রেখে মডেল টেস্ট দিতে হবে
  • দুর্বল বিষয়গুলো চিহ্নিত করে আলাদা প্রস্তুতি নিতে হবে

কারণ, সামান্য ভুলেই মেধাতালিকায় বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে জিএসটি গুচ্ছভুক্ত ১৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে প্রায় পৌনে তিন লাখ আবেদন এই ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা ও গুরুত্বই তুলে ধরে। এখন নজর সবারই আসন্ন ভর্তি পরীক্ষার দিকে—যেখানে মেধা, প্রস্তুতি ও কৌশলের সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ।

ইউনিটবিভাগআবেদনকারীর সংখ্যা
A ইউনিটবিজ্ঞান১,৫৯,১৮৯
B ইউনিটমানবিক৯০,৪০৪
C ইউনিটব্যবসায় শিক্ষা২৩,৯৬১
মোট২,৭৩,৫৫৪
ইউনিটপরীক্ষার তারিখ
C ইউনিট২৭ মার্চ ২০২৬
B ইউনিট৩ এপ্রিল ২০২৬
A ইউনিট১০ এপ্রিল ২০২৬

Leave a Comment