
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ আপাতত স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত পরীক্ষাটি এক মাসের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে আগামী ২১, ২২, ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা এই পরীক্ষা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আর হচ্ছে না।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর ২০২৫) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসান–এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) ১১ নভেম্বর জারি করা অফিস আদেশও স্থগিত করা হয়েছে, যেখানে মেধা যাচাই পরীক্ষার সময়সূচি ও কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কেন হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ আয়োজনের সিদ্ধান্তটি আগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাইকোর্ট রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—তা যাচাই করতেই আপাতত পরীক্ষাটি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরীক্ষা আয়োজনের বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন ওঠে।
এই পরীক্ষার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কেরানীগঞ্জ পাবলিক ল্যাবরেটরি স্কুলের পরিচালক মো. ফারুক হোসেন এবং আরও দুইজন অভিভাবক গত ১০ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটে বলা হয়, নাম পরিবর্তন করে হলেও মূলত এটি বৃত্তি পরীক্ষারই বিকল্প রূপ, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ স্বর্ণ–রুপার নতুন দাম: ভরিতে স্বর্ণ ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা
আদালতে কী বলা হয়েছে
রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী নিয়াজ মোর্শেদ। শুনানিতে তিনি বলেন,
“হাইকোর্টের আগের রায় কার্যকর না করেই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নতুন নামে পরীক্ষা চালু করতে চেয়েছে। এটি আদালতের নির্দেশ অমান্যের শামিল।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বৃত্তি পরীক্ষার নাম পরিবর্তন করে ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ রাখা হলেও পরীক্ষার উদ্দেশ্য, কাঠামো ও পরিধি প্রায় একই। শুধু পার্থক্য হলো—এ পরীক্ষায় শুধু সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক।
আইনজীবীর যুক্তি ছিল, আগের রায়ে যখন আদালত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন, তখন নতুন নামে পরীক্ষা চালু করে সেই নির্দেশ এড়িয়ে যাওয়া আইনসম্মত হতে পারে না।
আগের বৃত্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত রায়ের প্রেক্ষাপট
এই মামলার পেছনে রয়েছে বৃত্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ইতিহাস। চলতি বছরের শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সিদ্ধান্ত নেয় যে, শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একাধিক রিট দায়ের হয়।
সবশেষ ৩ নভেম্বর ওই রিটগুলোর চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। আদালত তখন স্পষ্ট নির্দেশনা দেন—
- ২০০৮ সালের বৃত্তি নীতিমালা অনুযায়ী
- বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যোগ্য শিক্ষার্থীদেরও
- বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে
এ নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিঠি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছিল।
আপিলের আবেদন এবং জটিলতা
তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আপিল করার আবেদন করেছে। সেই আপিল আবেদন এখনো শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ, উচ্চ আদালতের রায় এখনো বহাল থাকলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
এই অবস্থার মধ্যেই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নভেম্বর মাসে ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। রিটকারীদের অভিযোগ, আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালতের আগের রায় কার্যকর রাখার পরিবর্তে অধিদপ্তর কৌশলে নতুন পরীক্ষা চালু করতে চেয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ৯ কোটি ২০ লাখে কলকাতায় মোস্তাফিজ | IPL নিলাম
‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’—নাম বদল, উদ্দেশ্য একই?
আইনজীবী নিয়াজ মোর্শেদের মতে,
“এটি মূলত বৃত্তি পরীক্ষারই একটি নতুন সংস্করণ। শুধু নাম পরিবর্তন করে আদালতের রায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাই, ভবিষ্যৎ সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের লক্ষ্য—সবই বৃত্তি পরীক্ষার সঙ্গে মিল রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়ায় এটি সংবিধানের সমতার নীতি এবং শিক্ষায় বৈষম্য নিষিদ্ধ করার বিধান–এর পরিপন্থী।
হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী আদেশ
সব দিক বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট আপাতত পরীক্ষাটি এক মাসের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আদালত বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে,
- পরীক্ষাটি আয়োজনের আইনি ভিত্তি কী
- আগের রায়ের সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক কি না
- শুধুমাত্র সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা বৈধ কি না
এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা চালু রাখা সমীচীন নয়।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া
হাইকোর্টের এই আদেশের পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সরকারি বিদ্যালয়ের অনেক অভিভাবক হতাশ হলেও বেসরকারি বিদ্যালয়ের অভিভাবকেরা আদেশটিকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করছেন।
এক অভিভাবক বলেন,
“একই বয়স, একই পাঠ্যক্রম—তবু শুধু স্কুলের ধরন দেখে সুযোগ দেওয়া হবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
অন্যদিকে কিছু শিক্ষক মনে করছেন, বারবার আইনি জটিলতায় শিক্ষাবর্ষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক স্তরে পরীক্ষাভিত্তিক প্রতিযোগিতা চালুর আগে স্পষ্ট নীতিমালা ও আইনি কাঠামো থাকা জরুরি। নচেৎ এমন জটিলতা বারবার তৈরি হবে।
তারা বলছেন,
- সরকার ও আদালতের নির্দেশনার মধ্যে সমন্বয় জরুরি
- সব ধরনের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে
- পরীক্ষার উদ্দেশ্য ও ফলাফল স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ করা দরকার
সামনে কী হতে পারে
আইনজীবীরা বলছেন, এক মাসের এই স্থগিতাদেশের মধ্যে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ শুনানি হতে পারে। আপিল আবেদন ও রিট—দুটোর ভবিষ্যৎ নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করবে ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ আদৌ চালু হবে কি না, কিংবা নতুন কাঠামোতে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে পরীক্ষা আয়োজন করতে হবে কি না।
সব মিলিয়ে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ঘোষিত ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ এখন আইনি জটিলতার মুখে পড়েছে। হাইকোর্টের এক মাসের স্থগিতাদেশ শুধু একটি পরীক্ষাই বন্ধ করেনি, বরং প্রাথমিক শিক্ষায় সমতা, ন্যায়বিচার ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। এখন দেখার বিষয়, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে মামলার গুরুত্ব
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি কেবল একটি পরীক্ষা স্থগিতের বিষয় নয়; বরং এটি শিক্ষা খাতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের জন্য আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের ক্ষেত্রে ভিন্নতা সৃষ্টি হলে তা আদালতের নজরে আসাই স্বাভাবিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের বৃত্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত রায়ের পর নতুন নামে একই ধরনের পরীক্ষা আয়োজন করা হলে সেটিকে আদালত “colourable exercise of power” হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন—অর্থাৎ ক্ষমতার অপব্যবহার।
শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও প্রস্তুতির প্রভাব
হঠাৎ করে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তারা এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছে। শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এমন অনিশ্চয়তা তাদের পড়াশোনার আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন অভিভাবক বলেন,
“আমাদের সন্তানকে বলা হয়েছিল নির্দিষ্ট তারিখে পরীক্ষা হবে। এখন আবার বন্ধ। এতে শিশুরা বুঝতেই পারছে না সামনে কী হবে।”
বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের দাবি
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের দাবি, তারা বহু বছর ধরেই বৃত্তি ও মেধা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ চেয়ে আসছেন। তাদের মতে, পাঠ্যক্রম যখন একই, তখন কেবল প্রতিষ্ঠান সরকারি বা বেসরকারি—এই ভিত্তিতে সুযোগ সীমিত করা যুক্তিসংগত নয়।
এক বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন,
“আমাদের শিক্ষার্থীরাও জাতীয় কারিকুলামে পড়ে। কিন্তু পরীক্ষার সুযোগে বারবার তারা বঞ্চিত হয়।”
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অবস্থান কী হতে পারে
যদিও এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে—আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই রাখতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, অধিদপ্তর চাইলে
- সব ধরনের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করে
- নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে
- অথবা পরীক্ষার কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত
হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় অনুযায়ী ভবিষ্যতে প্রাথমিক স্তরের সব ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে একক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়ন বাধ্যতামূলক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, এই মামলার রায় শুধু ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ নয়—
- বৃত্তি পরীক্ষা
- ট্যালেন্টপুল নির্বাচন
- বিশেষ সুযোগভিত্তিক মূল্যায়ন
সবকিছুর জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ স্থগিতের মাধ্যমে হাইকোর্ট শুধু একটি পরীক্ষাই বন্ধ করেননি, বরং প্রাথমিক শিক্ষায় ন্যায্যতা, সমতা ও আইনানুগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এনেছেন। এখন আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসন—সবার দৃষ্টি।