
জাতীয় নির্বাচনের আগে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং সহিংস ও সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে শিগগিরই ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ–২’ চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান অভিযানের পাশাপাশি নতুন এই ধাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অপরাধ দমনে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান।
কেন ‘ডেভিল হান্ট ফেইজ–২’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে লুটপাট, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের ঘটনায় সরকার কোনো ধরনের ছাড় দিতে চায় না। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে এই অভিযানকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, কোর কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবিলম্বে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ–২’ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হবে—
- অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার
- সহিংস রাজনৈতিক তৎপরতা প্রতিরোধ
- সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
- নির্বাচনী পরিবেশ নিরাপদ রাখা
আরও পড়ুনঃ ওসমান হাদির অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন, ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে চিকিৎসকরা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের নিরাপত্তা
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া সম্মুখসারির যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ লক্ষ্যে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব যোদ্ধাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদানের জন্য একটি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সার্বিকভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনা
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনা সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এই হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই ঘটনায় জড়িত কাউকেই আইনের বাইরে রাখা হবে না। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
হামলাকারী ধরিয়ে দিতে পুরস্কার
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওসমান হাদির ওপর হামলায় জড়িত মূল অপরাধী বা অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে জনগণকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তারেক রহমানের নিরাপত্তা প্রসঙ্গ
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে প্রত্যাবর্তন করলে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সরকার এ বিষয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তিনি জানান, তারেক রহমান দেশে ফিরলে তাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি রাখা হবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আরও পড়ুনঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি – তফসিল ঘোষণা
নির্বাচনী প্রার্থীদের অস্ত্র লাইসেন্স
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও জানান, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু সংক্রান্ত নীতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এতদিন কেবল সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মচারীরা অস্ত্রের লাইসেন্স পেতেন। তবে এবার জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তার মতে, নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রার্থীদের আত্মরক্ষায় সহায়ক হবে।
উপস্থিত কর্মকর্তারা
ব্রিফিংকালে উপস্থিত ছিলেন—
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি
- পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বিপিএম
- সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
সার্বিক মূল্যায়ন
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারের এই পদক্ষেপ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ–২’ বাস্তবায়ন হলে সহিংসতা ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারের নেওয়া এই কঠোর উদ্যোগ সময়োপযোগী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনকে ঘিরে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সহিংসতা, ভীতি সৃষ্টি ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। সে বাস্তবতায় ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ–২’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এ ধরনের অপতৎপরতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু অপরাধ দমনই নয়, সাধারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধও বৃদ্ধি পাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি ও ধারাবাহিক অভিযান নির্বাচনী এলাকায় ভীতি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলোর মনোবল দুর্বল করবে, যা শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে।
একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙার উদ্যোগ রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত সরকারের দায়বদ্ধতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে রাষ্ট্রের প্রতি এসব নাগরিকের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, অভিযানের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ওপর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি কোনো ধরনের পক্ষপাত ছাড়াই আইন প্রয়োগ করে এবং মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, তাহলে এই অভিযান দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করবে।
সব মিলিয়ে, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ–২’ শুধু একটি নিরাপত্তা অভিযান নয়; বরং এটি জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে স্থিতিশীলতা, আস্থা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল।