
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও সুদের হার সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্পট মার্কেটে স্বর্ণের প্রতি আউন্স মূল্য ৪ হাজার ৩৮৩ ডলারের ঘর ছুঁয়েছে, যা বিনিয়োগ মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় মূল্যবান এই ধাতু আবারও তার ঐতিহাসিক শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের রেকর্ড মূল্য
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২২ ডিসেম্বর) বৈশ্বিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৮৩ দশমিক ৭৩ ডলারে পৌঁছায়। এর মধ্য দিয়ে স্বর্ণ নতুন এক মূল্যরেকর্ড গড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত, ডলারের মান দুর্বল হয়ে পড়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই তিনটি প্রধান কারণ একসঙ্গে কাজ করায় স্বর্ণের দাম এত দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা সাধারণত যখন শেয়ারবাজার বা মুদ্রাবাজারে ঝুঁকি বাড়তে দেখেন, তখন তারা স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঠিক সেটাই ঘটছে।
সুদের হার কমানো ও ডলারের দুর্বলতা
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কোয়ার্টার-পয়েন্ট কমিয়েছে। সুদের হার কমলে সাধারণত ডলার দুর্বল হয়, আর ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বাড়ে—কারণ ডলারে মূল্যায়িত স্বর্ণ অন্যান্য মুদ্রাধারীদের কাছে তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুদের হার আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রানীতিতে আরও শিথিলতা আসতে পারে। এই প্রত্যাশাও স্বর্ণের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আরও পড়ুনঃ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সেবা: খরচ, সুবিধা ও বাংলাদেশে অপশন
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত, বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বর্ণ বরাবরই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ ক্রয়
চলতি বছরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ কিনেছে। বিশেষ করে চীন, রাশিয়া, ভারতসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই ধারাবাহিক স্বর্ণ ক্রয় বিশ্ববাজারে চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামের ওপর। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরও স্বর্ণের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। সুদের হার কমার সম্ভাবনা, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি—সব মিলিয়ে স্বর্ণের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
অনেক বিনিয়োগকারী ইতোমধ্যে তাদের পোর্টফোলিওতে স্বর্ণের অংশ বাড়াচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য স্বর্ণ এখনো একটি কার্যকর বিনিয়োগ মাধ্যম।
আরও পড়ুনঃ অনলাইনে শূন্য আয়কর (Zero Return) জমা দেওয়ার সহজ নিয়ম
দেশের বাজারেও স্বর্ণের দামে রেকর্ড
বিশ্ববাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারেও। দেশের স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সর্বশেষ দফায় ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
নতুন মূল্য তালিকা
বাজুস ঘোষিত নতুন দর অনুযায়ী—
- ২২ ক্যারেট স্বর্ণ: প্রতি ভরি ২ লাখ ১৮ হাজার ১১৭ টাকা
- ২১ ক্যারেট স্বর্ণ: প্রতি ভরি ২ লাখ ৮ হাজার ২০২ টাকা
- ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ: প্রতি ভরি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৫৯ টাকা
- সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ: প্রতি ভরি ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৯৯ টাকা
এই দামের মাধ্যমে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের মূল্য সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
চলতি বছরে ঘন ঘন মূল্য সমন্বয়
চলতি বছর বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে দামের ব্যাপক অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। এখন পর্যন্ত ৮৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে, যা বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর কাঠামোর প্রভাবও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
গয়না শিল্পে প্রভাব
স্বর্ণের দাম বাড়ায় দেশের গয়না শিল্পে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে ব্যবসায়ীদের মূলধন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে গয়না কেনার আগ্রহ কিছুটা কমেছে।
তবে উৎসব মৌসুম ও বিয়ের সময় ঘনিয়ে এলে স্বর্ণের চাহিদা আবার বাড়তে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকেই এখন গয়না না কিনে স্বর্ণকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।
সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
স্বর্ণের এই রেকর্ড মূল্য সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য স্বর্ণ কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া পরিবারগুলোর বাজেটে বড় চাপ পড়ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, স্বর্ণের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে এমন উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে গয়না শিল্পে বিক্রি আরও কমে যেতে পারে।
স্বর্ণের বাজার: সামনে কী হতে পারে?
বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দাম। যদি সুদের হার আরও কমে এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বর্ণের দাম নতুন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
তবে কোনো বড় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে বা ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণের দামে সাময়িক সংশোধনও দেখা যেতে পারে। বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ববাজার থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বাজার—সবখানেই স্বর্ণ এখন আলোচনার কেন্দ্রে। নতুন রেকর্ড দামের মাধ্যমে স্বর্ণ আবারও প্রমাণ করেছে, অনিশ্চিত সময়ে এটি বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে আস্থার প্রতীক। তবে সাধারণ মানুষের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্ব অর্থনীতি কোন পথে এগোয়, সেটির ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হবে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ গতিপথ। আপাতত বলা যায়, স্বর্ণের বাজারে উত্তাপ এখনো কমার কোনো লক্ষণ নেই।
🔹 কেন স্বর্ণ আবার বিনিয়োগকারীদের প্রথম পছন্দ?
বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার ও রাজনৈতিক ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়তে থাকে, তখন বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকেন। স্বর্ণ দীর্ঘদিন ধরেই সেই নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা বা মুদ্রার মান কমে গেলে স্বর্ণ সাধারণত স্থিতিশীল থাকে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনৈতিক নীতিতে অনিশ্চয়তা থাকায় স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছে।
🔹 মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে স্বর্ণের সম্পর্ক
অর্থনীতিবিদদের মতে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে কাগুজে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। তখন মানুষ তাদের সম্পদের মূল্য ধরে রাখতে স্বর্ণের মতো বাস্তব সম্পদে বিনিয়োগ করে। চলতি বছরে বিভিন্ন দেশে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বেড়ে যাওয়ায় স্বর্ণের বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের দাম দীর্ঘমেয়াদেও উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
🔹 বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনের স্থানীয় কারণ
বিশ্ববাজারের পাশাপাশি দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে কিছু স্থানীয় কারণও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া
- আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি
- শুল্ক ও কর কাঠামোর প্রভাব
- স্বর্ণের সরবরাহ সীমিত হওয়া
এই সব কারণ একত্রে কাজ করায় আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশীয় বাজারে স্বর্ণের দাম তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ছে।
🔹 গয়না না বিনিয়োগ: বদলাচ্ছে ক্রেতার আচরণ
আগে স্বর্ণ কেনা মানেই ছিল গয়না কেনা। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। অনেকেই এখন অলংকার না বানিয়ে স্বর্ণের বার বা কয়েন কেনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ বিনিয়োগ হিসেবে এসব স্বর্ণ ভবিষ্যতে সহজে বিক্রি করা যায় এবং মূল্য ধরে রাখার সম্ভাবনাও বেশি।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে তরুণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়ছে।
🔹 স্বর্ণের দাম কি আরও বাড়বে? বিশেষজ্ঞ মতামত
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দাম ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—
- যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতি
- বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
- ডলারের শক্তি বা দুর্বলতা
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রবণতা
যদি এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বজায় থাকে, তাহলে স্বর্ণের দাম আরও নতুন উচ্চতায় যেতে পারে।
🔹 সাধারণ মানুষের জন্য করণীয় কী?
স্বর্ণের দাম যখন রেকর্ড পর্যায়ে, তখন হুট করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ না করাই ভালো বলে মনে করছেন অর্থ বিশেষজ্ঞরা। বরং—
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ
- প্রয়োজন ছাড়া গয়না কেনা এড়িয়ে চলা
- বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
🔹 সংক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ
- চলতি বছরে দাম বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ
- দেশে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা
- ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৮৭ বার দাম সমন্বয়
- বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে