বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি ও নেতৃত্ব

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নেতৃত্বের ছবি
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া—বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক ঐতিহাসিক নাম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কয়েকজন নেতা ইতিহাস গড়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া একটি অবিচ্ছেদ্য নাম। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, বরং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রতীক। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপার্সন এবং সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগের নেত্রী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ, জটিল ও ঘটনাবহুল।

শৈশব ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট

বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতার নাম ইস্কান্দার মজুমদার এবং মাতার নাম তৈমুরন্নেসা। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, সংযত ও আত্মমর্যাদাশীল। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও পরিবারিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ তাঁর চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী

১৯৬০ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং পরবর্তীতে তাঁর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উত্থান খালেদা জিয়ার জীবনকে আমূল পরিবর্তন করে।

১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়েও খালেদা জিয়া সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী ও গৃহিণী।

রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে দেশের রাজনীতিতে এক গভীর সংকট সৃষ্টি হয়। এই শোকাবহ ঘটনার পর বিএনপি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার।

১৯৮২ সালে তিনি বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একজন রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ গৃহিণী থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসা—এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা।

আরও পড়ুনঃ ২০২৬ সালে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ছুটি ৬৪ দিন, প্রকাশিত পূর্ণ ছুটি তালিকা

সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব

৮০’র দশকে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগ, বাম দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে তিনি রাজপথে সক্রিয় হন।

কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব ও দমন-পীড়নের মধ্যেও তিনি আন্দোলন থেকে সরে যাননি। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত হয়।

১৯৯১: প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়। বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

এই মেয়াদে তাঁর অন্যতম ঐতিহাসিক অবদান ছিল—

  • রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা বাতিল
  • সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন
  • বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা জোরদার

১৯৯১ সালের সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে, যা তাঁর নেতৃত্বের বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত।

১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সংকট

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে দেশব্যাপী রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। বিরোধীদের বর্জনের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এই সময় রাজনৈতিকভাবে বেগম খালেদা জিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি কমে যায়নি।

২০০১: দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি বিপুল বিজয় অর্জন করে। বেগম খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

এই মেয়াদে—

  • অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি
  • নারী শিক্ষায় অগ্রগতি
  • গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন
  • দারিদ্র্য বিমোচনে কিছু কর্মসূচি

বাস্তবায়িত হলেও, জঙ্গিবাদ, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও রাজনৈতিক সহিংসতা তাঁর সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ওয়ান-ইলেভেন ও রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের রাজনীতি নতুন মোড় নেয়। বেগম খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ে। এই সময় তাঁর দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।

২০১৮ সালের নির্বাচন ও কারাবরণ

দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাবরণ করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারেননি। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। শারীরিক অসুস্থতা, আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে তিনি কার্যত রাজনীতির কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যান।

গণতন্ত্র ও নারীর নেতৃত্বে ভূমিকা

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নন, তবে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নারী সরকারপ্রধান। দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তিনি একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

তিনি রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দলীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন এবং মহিলা উইংকে শক্তিশালী করেন।

রাজনৈতিক আদর্শ ও মূল্যায়ন

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি মূলত—

  • জাতীয়তাবাদ
  • বহুদলীয় গণতন্ত্র
  • সার্বভৌমত্ব রক্ষা
  • সংসদীয় শাসনব্যবস্থা

এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সমালোচনা যেমন আছে, তেমনি তাঁর অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্থান-পতনের প্রতিচ্ছবি। শোক থেকে শক্তি, গৃহিণী থেকে রাষ্ট্রনায়ক, কারাবরণ থেকে রাজনৈতিক প্রতীক—এই দীর্ঘ পথচলা তাঁকে ইতিহাসে আলাদা করে স্থান দিয়েছে।

সময় ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালেও, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে—একজন সংগ্রামী, দৃঢ়চেতা ও প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে।

১. রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শ

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা। তিনি সবসময় শক্তিশালী সংসদ, নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ও কর্মসূচিতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।

২. তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা

১৯৯৬ ও পরবর্তীকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। যদিও এই ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল, তবুও এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। এই ব্যবস্থার অধীনেই দীর্ঘ সময় দেশে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

৩. আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অবস্থান

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বেগম খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ভারত, চীন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে তিনি কাজ করেন। ওআইসি ও সার্ক সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান করেছে।

৪. সমালোচনা ও বিতর্ক (Balance আনতে জরুরি)

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে সমালোচনা ও বিতর্কও রয়েছে। তাঁর শাসনামলে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিরোধী দমন, জঙ্গিবাদ প্রশ্ন এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তবে সমর্থকদের মতে, এসব বিষয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফল।

৫. কারাবরণ ও মানবিক দিক

দীর্ঘ কারাবাস ও গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী চরিত্রে পরিণত হন। তাঁর মুক্তি ও চিকিৎসা নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা তাঁকে রাজনীতির বাইরে গিয়েও প্রাসঙ্গিক করে রাখে। এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মানবিক অধ্যায়।

৬. উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রভাব শুধু তাঁর সক্রিয় সময়েই সীমাবদ্ধ নয়। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক ভাষা ও আন্দোলনের ধারায় তাঁর চিন্তার প্রতিফলন এখনও স্পষ্ট। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিতেও তাঁর উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

Leave a Comment