স্বর্ণের দাম বিশ্ব ইতিহাসে সর্বোচ্চ: ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ডলার দুর্বলতায় নতুন রেকর্ড

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বিশ্ব ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ডলার দুর্বলতায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়েছে

স্বর্ণের দাম বিশ্ব ইতিহাসে সর্বোচ্চ, নতুন অনিশ্চয়তায় নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা

বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে স্বর্ণের দাম দুনিয়ার সব পূর্বের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের এই ঊর্ধ্বগতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে ঘিরে সম্ভাব্য বাণিজ্য উত্তেজনা, মার্কিন ডলারের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে অস্থিরতার কারণেই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।

বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু ভূরাজনৈতিক অবস্থান—বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের উদ্যোগ—বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে স্বর্ণের বাজারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের রেকর্ড উত্থান

বুধবার ২১ জানুয়ারি, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম একদিনেই ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪,৮২১ দশমিক ২৬ ডলারে পৌঁছায়। দিনের একপর্যায়ে দাম আরও বেড়ে সর্বোচ্চ ৪,৮৪৩ দশমিক ৬৭ ডলার স্পর্শ করে, যা বিশ্ব ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে এই দাম দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৯২ হাজার ৮০৬ টাকা প্রতি আউন্স, যা স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

এদিকে, ফেব্রুয়ারি মাসে ডেলিভারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচারস বাজারেও স্বর্ণের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪,৮১৩ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছেছে।

আরও পড়ুনঃ আইএসডিবি আইটি স্কলারশিপ প্রশিক্ষণ ২০২৬ | ফ্রি আইটি কোর্স

কেন হঠাৎ স্বর্ণের দামে এত বড় লাফ?

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্থান একক কোনো কারণে হয়নি; বরং একাধিক আন্তর্জাতিক ঘটনা একসঙ্গে প্রভাব ফেলেছে।

ক্যাপিটাল ডটকমের সিনিয়র মার্কেট অ্যানালিস্ট কাইল রডা বলেন,
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ইউরোপের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

রডার ভাষ্য অনুযায়ী,

“বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ডলার ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ড থেকে সরে এসে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন। কারণ এ মুহূর্তে মার্কিন মুদ্রার তুলনায় স্বর্ণকে বেশি নিরাপদ মনে করা হচ্ছে।”

ডলারের দুর্বলতা ও শেয়ারবাজারের পতন

গত তিন সপ্তাহ ধরে ইউরো ও সুইস ফ্রাঁর বিপরীতে মার্কিন ডলার প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ওপর নির্ভরশীল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

একই সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে টানা তৃতীয় দিনের মতো পতন দেখা যাচ্ছে। যদিও বৈশ্বিক বন্ডবাজারে বিক্রির চাপ কিছুটা কমেছে, তবু সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য করছে।

এই প্রেক্ষাপটেই স্বর্ণ আবারও প্রমাণ করছে—অনিশ্চয়তার সময়ে এটি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সম্পদগুলোর একটি।

🇧🇩 আন্তর্জাতিক প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের এই ঊর্ধ্বগতির প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে। বুধবার থেকেই দেশের বাজারে নতুন ও বাড়তি দামে স্বর্ণ বিক্রি শুরু হয়েছে

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম বাড়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দেশে স্বর্ণের নতুন দাম কত?

মঙ্গলবার ২০ জানুয়ারি, বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং–এর এক বৈঠকে স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীনের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দেশের বাজারে স্বর্ণের নতুন দাম হলো—

  • ২২ ক্যারেট: প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৪ হাজার ১২৮ টাকা
  • ২১ ক্যারেট: প্রতি ভরি ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৮৮ টাকা
  • ১৮ ক্যারেট: প্রতি ভরি ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭৪৬ টাকা
  • সনাতন পদ্ধতি: প্রতি ভরি ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮২১ টাকা

এই দাম বুধবার থেকেই কার্যকর হয়েছে।

কেন বাড়ানো হলো দেশের স্বর্ণের দাম?

বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পাকা স্বর্ণ) দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রাখতে স্বর্ণের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের চাপ—সব মিলিয়েই দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ কতটা নিরাপদ?

অর্থনীতিবিদদের মতে,

  • ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা
  • মুদ্রাস্ফীতি
  • শেয়ারবাজারের অস্থিরতা
  • ডলারের দুর্বলতা

এই চারটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে স্বর্ণ সাধারণত সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, ব্যাংক আমানত বা শেয়ারবাজারের তুলনায় স্বর্ণ এখনো দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ বিনিয়োগ হতে পারে।

সামনে কী হতে পারে স্বর্ণের বাজারে?

বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে বা বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামে, তাহলে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে।

তবে কেউ কেউ সতর্ক করে বলছেন, বাজার স্থিতিশীল হলে বা সুদের হার সংক্রান্ত বড় কোনো সিদ্ধান্ত এলে স্বর্ণের দামে স্বল্পমেয়াদি সংশোধনও দেখা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বর্ণের দাম বর্তমানে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মুদ্রাবাজারের টানাপোড়েন—সবকিছু মিলিয়েই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। বিনিয়োগকারী ও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাজার পরিস্থিতি বুঝে সতর্ক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

Leave a Comment