
৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির সুপারিশপ্রাপ্ত হাজারো শিক্ষক মাসের পর মাস বেতনহীন, চরম অনিশ্চয়তায় কারিগরি শিক্ষা
দেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট কাটাতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যে বৃহৎ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তা নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে নতুন সংকট ও বৈষম্যের অভিযোগ। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পর্যায়ের অধিকাংশ সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) সুবিধার আওতায় এলেও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত বিপুলসংখ্যক শিক্ষক আজও সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
ফলে মাসের পর মাস বেতন-ভাতা না পেয়ে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ ও পেশাগত হতাশার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকরা। শিক্ষা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে এ ধরনের বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তি: বড় উদ্যোগ, অসম বাস্তবতা
এনটিআরসিএ সূত্রে জানা যায়, দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ১ লাখ ৮২২টি শূন্য পদের বিপরীতে ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এই বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর শিক্ষক নিয়োগে আশার আলো দেখেছিলেন নিবন্ধনধারী হাজারো প্রার্থী।
তবে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক চাহিদা বাতিলসহ নানা কারণে শেষ পর্যন্ত ৪১ হাজার ৬২৬ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। সুপারিশপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে এমপিওভুক্ত হয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলেও সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা।
আরও পড়ুনঃ ঢাবির কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা ২০২৫: প্রতি আসনে লড়াই ৩৭ জন
এমপিওভুক্তিতে বৈষম্যের অভিযোগ
কারিগরি শিক্ষকদের অভিযোগ, নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রশাসনিক ধাপ এবং সমন্বয়ের অভাবে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। একই সময় সুপারিশপ্রাপ্ত স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা যখন নিয়মিত সরকারি অংশের বেতন পাচ্ছেন, তখন কারিগরি শিক্ষকরা বিনা বেতনে পাঠদান চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, সংসার চালানো, বাসাভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে তারা চরম সংকটে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ধার-দেনা করে কিংবা বিকল্প কাজ করে জীবনধারণ করতে হচ্ছে, যা একজন পূর্ণকালীন শিক্ষকের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ও হতাশাজনক।
‘সুপারিশ পেয়েও বেতন নেই’—শিক্ষকদের ক্ষোভ
সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক মামুন (ছদ্মনাম) বলেন,
“নিয়োগের সুপারিশ পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনো আমার এমপিও কার্যকর হয়নি। অথচ একই বিজ্ঞপ্তির আওতায় সুপারিশপ্রাপ্ত অন্য শিক্ষকেরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। এটি স্পষ্ট বৈষম্য। একজন শিক্ষক হিসেবে এমন পরিস্থিতি আমাদের পেশাগত মর্যাদা ও মানসিক স্থিতিকে ভেঙে দিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,
“আমরা সরকারের কাছে বিশেষ কোনো সুযোগ চাই না—শুধু সুপারিশ অনুযায়ী আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই। দ্রুত এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করা হলে এই অনিশ্চয়তা থেকে আমরা মুক্তি পাব।”
কারিগরি শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কারিগরি শিক্ষকদের এমপিও জটিলতা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি কাঠামোগত সংকেত। দক্ষ জনশক্তি গঠনে কারিগরি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ এই খাতের শিক্ষকরা যদি আর্থিক নিরাপত্তা না পান, তাহলে—
- দক্ষ শিক্ষক ধরে রাখা কঠিন হবে
- নতুন শিক্ষক এই খাতে আসতে নিরুৎসাহিত হবেন
- পাঠদানের মান ও ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে
- দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জাতীয় লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে
এ কারণে বিষয়টিকে কেবল প্রশাসনিক জটিলতা হিসেবে না দেখে নীতিগত গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।
এমপিও জটিলতা নিরসনে আশার বার্তা
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর অবশ্য বিষয়টি নিয়ে আশাবাদী অবস্থানের কথা জানিয়েছে। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কারিগরি শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং শিগগিরই অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মোট ৪০০ জন কারিগরি শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ফাইল প্রস্তুত ও উত্থাপন করা হয়েছে। এসব ফাইল যাচাই-বাছাই শেষে দুটি পৃথক ধাপে এমপিও কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দুই ধাপে এমপিও কার্যক্রমের পরিকল্পনা
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- প্রথম ধাপে ২৮০টি ফাইল অনুমোদনের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে
- দ্বিতীয় ধাপে অবশিষ্ট ১২০টি ফাইল অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে
এই দুই ধাপ শেষ হলে সুপারিশপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক এমপিও সুবিধার আওতায় আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
অধিদপ্তরের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পিআইইউ) মাকসুদুর রহমান বলেন,
“শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জন্য অধিদপ্তর থেকে মোট ৪০০টি ফাইল উত্থাপন করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে দুইটি লটে এসব ফাইল নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২৮০টি ফাইল রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি খুব শিগগিরই সম্পন্ন হবে।”
তিনি আরও জানান,
“বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছুটিতে থাকায় এসব ফাইলে স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি দায়িত্বে ফিরলেই প্রথম ধাপের ফাইলগুলোতে স্বাক্ষর করবেন। এরপর দ্রুত পরবর্তী ধাপের কাজও শুরু হবে।”
কেন অনেক আবেদন বাতিল?
এদিকে এমপিওভুক্তির আশায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়লেও সব আবেদন অনুমোদন পাচ্ছে না। অধিদপ্তর সূত্র জানায়, নির্ধারিত নীতিমালা ও অবকাঠামোগত যোগ্যতা পূরণ করতে না পারায় অনেক আবেদন বাতিল হয়েছে।
বিশেষ করে—
- পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকা
- পাসের হার সন্তোষজনক না হওয়া
- প্রয়োজনীয় ল্যাব ও অবকাঠামোর ঘাটতি
- নির্ধারিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত পূরণ না হওয়া
এ ধরনের কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান ও তাদের শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
মানদণ্ড বজায় রাখার ওপর জোর
মাকসুদুর রহমান আরও বলেন,
“প্রাথমিকভাবে উত্থাপিত ৪০০টি ফাইলের বাইরে থাকা অনেক আবেদন বাস্তবতা বিবেচনায় উদ্বেগজনক। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিত করা। সে কারণেই যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্তি শুধু আর্থিক সুবিধা নয়, এটি শিক্ষার মানের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
আবেদন ও সুপারিশের পরিসংখ্যান
প্রসঙ্গত, ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে—
- মোট শূন্য পদ: ১ লাখ ৮২২টি
- মোট আবেদনকারী: ৫৭ হাজার ৮৪০ জন
- চাহিদা বাতিল হওয়া পদ: ৭৮০টি
- ভুল পদ ও প্রতিষ্ঠান ধরণে আবেদন করায় বাতিল: ১২৫ জন
- চূড়ান্তভাবে নিয়োগ সুপারিশ: ৪১ হাজার ৬২৭ জন
- আবেদন করেও বাদ পড়েছেন: ১৬ হাজার ২১৩ জন
দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা
কারিগরি শিক্ষকরা মনে করছেন, প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় জোরদার করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হলে এ সংকট অনেক আগেই নিরসন সম্ভব ছিল। এখন তারা চান, ঘোষণার বাইরে বাস্তব অগ্রগতি।
শিক্ষকদের ভাষায়,
“আশ্বাস নয়, আমরা চাই কার্যকর সিদ্ধান্ত। এমপিওভুক্তি হলে তবেই এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে।”