৫ বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া তামীম: নিজের স্বপ্নই অনুপ্রেরণা

পাঁচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া শিক্ষার্থী তামীম হাসান
নিজের স্বপ্নকে অনুপ্রেরণা করে পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন তামীম

এক শিক্ষার্থীর অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তির গল্প

২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) ভর্তি পরীক্ষায় একযোগে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে আলোচনায় এসেছেন তামীম হাসান। কঠিন প্রতিযোগিতামূলক এই ভর্তি পরীক্ষায় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো অবস্থান অর্জন করা নিঃসন্দেহে বিরল সাফল্য। তবে তামীমের মতে, এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার নিজের স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস এবং ইতিবাচক মানসিকতা

ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, তামীম হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটে ১৪৮তম স্থান অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ইউনিটে ৫ম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিটে ৮৯তম, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে ৯ম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটে ২৭৩তম স্থান লাভ করেন। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সাফল্য শিক্ষাঙ্গনে ইতিমধ্যেই প্রশংসিত হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং: উচ্চশিক্ষা কমিশনের খসড়া

‘এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন’—সাফল্যের অনুভূতি তামীমের কণ্ঠে

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তামীম হাসান বলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ। এটা আমার জীবনের এক অভূতপূর্ব আনন্দের মুহূর্ত। দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম, অসংখ্য রাত জেগে পড়াশোনা আর নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই—সবকিছুর যেন এক সুন্দর স্বীকৃতি পেলাম।”

তিনি আরও বলেন, এই অর্জন কেবল তার একার নয়। এর পেছনে রয়েছে পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের অবিরাম সহযোগিতা।
“আমার বাবা-মা সবসময় নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছেন। শিক্ষকরা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, আর বন্ধুরা কঠিন সময়ে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। তাদের অবদান ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না।”

ভর্তি প্রস্তুতি কেন আলাদা—তামীমের বিশ্লেষণ

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে তামীমের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ বাস্তবভিত্তিক। তার মতে, ভর্তি পরীক্ষা অন্যান্য পরীক্ষার মতো নয়।
“অ্যাডমিশন পরীক্ষাগুলো মূলত প্রতিযোগিতামূলক। এখানে পাস করাই আসল নয়, বরং অন্যদের তুলনায় নিজেকে এগিয়ে রাখাটাই মুখ্য।”

তিনি জানান, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই ভর্তি প্রস্তুতির একটি বড় অংশ শেষ করার চেষ্টা করেছিলেন।
“যদিও সব বিষয় পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হয়নি, তবে ইংরেজির জন্য আমি পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলতে পেরেছিলাম। ফলে ভর্তি পরীক্ষার সময় এই বিষয়টি নিয়ে আলাদা চাপ অনুভব করতে হয়নি।”

ইংরেজি বিষয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি হওয়ায় অন্যান্য বিষয়—বাংলা, সাধারণ জ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর সময় ভাগ করে পড়ার সুযোগ পান তিনি।

গভীরভাবে পড়াই ছিল কৌশল

তামীমের প্রস্তুতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর অধ্যয়ন। তিনি বলেন,
“আমি কোনো টপিক পড়লে সেটি একাধিক বই থেকে খুঁটিয়ে পড়তাম। একই বিষয়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা পড়ার চেষ্টা করতাম, যেন প্রশ্ন যেভাবেই আসুক, আটকে না যাই।”

একটি বিষয় আয়ত্তে না আসা পর্যন্ত তিনি পরবর্তী অধ্যায়ে যেতেন না।
“আমি নিজেকে একটা মানদণ্ডে বেঁধে রেখেছিলাম—যদি কাউকে বুঝিয়ে বলতে না পারি, তাহলে ধরে নিতাম আমি সেটা এখনো ঠিকভাবে শিখিনি।”

এই অভ্যাসই তাকে পরীক্ষার হলে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে বলে মনে করেন তিনি।

নিজের স্বপ্নই ছিল প্রধান অনুপ্রেরণা

প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কী ছিল—এমন প্রশ্নে তামীমের উত্তর ছিল পরিষ্কার,
“আমার নিজের স্বপ্ন।”

তিনি বলেন,
“মা-বাবার মুখে হাসি দেখার ইচ্ছা আমাকে অনেক রাত জাগতে সাহস দিয়েছে। নিজেকে প্রমাণ করার একটা তাগিদ সবসময় কাজ করত।”

তিনি বিশ্বাস করতেন, পথ যত কঠিন হবে, শেষটাও তত সুন্দর হবে। ভর্তি পরীক্ষাকে তিনি দেখতেন এক ধরনের মানসিক যুদ্ধ হিসেবে।
“ইতিহাসে আমরা দেখি, শুধু শক্তি দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না—জয় আসে দৃঢ় মনোবল থেকে। আমি সেটাই বিশ্বাস করতাম।”

বিখ্যাত চিন্তাবিদ Earl Nightingale-এর একটি উক্তির কথা উল্লেখ করেন—
“You become what you think about.”
এই দর্শন তাকে সবসময় ইতিবাচক থাকতে সাহায্য করেছে বলে জানান তামীম।

হতাশার মুহূর্তও এসেছিল

সাফল্যের গল্পের আড়ালেও ছিল হতাশার সময়। তামীম স্বীকার করেন,
“প্রস্তুতির পথে অনেক সময় মনে হতো আমি পারব না। চারপাশের সবার অগ্রগতি দেখে নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে হতো।”

তবে তিনি ছোট ছোট অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
“প্রতিদিনের জন্য ছোট লক্ষ্য ঠিক করতাম এবং সেটা পূরণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম।”

পরিবারের সমর্থন, কাছের কিছু মানুষের উৎসাহ এবং সচেতনভাবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকা তাকে মানসিকভাবে স্থির থাকতে সাহায্য করেছে।

পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল

ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পেছনে পরীক্ষার হলের কৌশলকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তামীম।
“পরীক্ষার হলে সবচেয়ে জরুরি হলো মাথা ঠান্ডা রাখা।”

তার কৌশল ছিল—

  • প্রথমে সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নগুলো সমাধান
  • যেগুলো নিশ্চিতভাবে পারতেন, সেগুলো আগে দাগিয়ে রাখা
  • পরে একটানা উত্তরপত্রে ভরাট করা

“এতে সময় বাঁচে। একই প্রশ্ন বারবার পড়তে হয় না।”

যে প্রশ্নগুলো পারতেন না, সেগুলো তিনি স্কিপ করতেন এবং শেষ দিকে সময় নিয়ে ভাবতেন। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি প্রায়ই নির্ধারিত সময়ের আগেই পরীক্ষা শেষ করতে পেরেছেন।

নতুন ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ

ভবিষ্যতের ভর্তি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে তামীমের পরামর্শ স্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক।
“কলেজে পড়াকালীন সময় থেকেই নিয়মিত প্রশ্নব্যাংক ও বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করতে হবে।”

একই সঙ্গে তিনি মানসিক দিকটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
“হতাশ হওয়া যাবে না। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং ইতিবাচক মানসিকতা ধরে রাখতে হবে।”

তামীম হাসানের সাফল্য প্রমাণ করে, ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল কেবল মেধার ওপর নির্ভর করে না; বরং পরিকল্পিত প্রস্তুতি, মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া এই শিক্ষার্থীর গল্প নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


শিক্ষা মন্ত্রণালয়:
https://www.moedu.gov.bd

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অফিসিয়াল সাইট:
https://www.du.ac.bd

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়:
https://www.juniv.edu

Leave a Comment