অনলাইনে শূন্য আয়কর (Zero Return) জমা দেওয়ার সহজ নিয়ম

শূন্য আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ধাপসমূহ, Bangla infographic
Zero Return জমা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ধাপসমূহ বাংলায়

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে আয়কর দাখিল করা প্রক্রিয়া অনেকটাই ডিজিটাল হয়েছে। সরকারের ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগের কারণে ট্যাক্স পেয়ারদের জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া এখন সহজ এবং দ্রুত। বিশেষ করে যারা আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে আছেন, তাদের জন্য শূন্য আয়কর বা Zero Return জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটি কেবল আইনগত প্রয়োজন নয়, বরং সরকারের কাছে আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব উপস্থাপন করার মাধ্যম।
অনলাইনে শূন্য আয়কর জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছে নতুন এবং জটিল মনে হতে পারে। তবে সঠিক তথ্য ও নির্দেশনার মাধ্যমে এটি খুব সহজে করা সম্ভব।

শূন্য আয়কর বা Zero Return কী?

অনেক মানুষ আয়কর রিটার্ন এবং জিরো রিটার্ন নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। অনেকেই ভাবেন যে শূন্য আয়কর জমা দেওয়ার জন্যও অর্থ প্রদান করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এটি একেবারেই ঠিক নয়।
জিরো রিটার্ন বা শূন্য আয়কর রিটার্ন বলতে বোঝায় এমন একটি আয়কর রিটার্ন যেখানে ট্যাক্স পেয়ারের আয়কর দায় শূন্য থাকে। অর্থাৎ, যিনি রিটার্ন দাখিল করছেন, তাকে কোনো টাকা সরকারকে জমা দিতে হবে না।
শূন্য আয়কর জমা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো:

  • আইনগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করা।
  • সরকারের কাছে নাগরিকের আয়ের সঠিক বিবরণ প্রদান করা।
  • ভবিষ্যতে আয়কর সংক্রান্ত কোনো বিতর্ক এড়ানো।
    শুধু তাই নয়, শূন্য আয়কর দাখিল করা ট্যাক্স পেয়ারের জন্য এক ধরনের নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে। কারণ এটি প্রমাণ করে যে, তার আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে রয়েছে এবং তিনি সময়মতো আইন মেনে চলেছেন।

আরও পড়ুনঃ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সেবা: খরচ, সুবিধা ও বাংলাদেশে অপশন

কাদের জমা দিতে হবে

প্রত্যেক টিআইএনধারী নাগরিকের জন্যই রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। তবে, শূন্য রিটার্ন দেওয়ার জন্য আপনার বার্ষিক মোট আয় অবশ্যই সরকার কর্তৃক নির্ধারিত করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকতে হবে। আপনার জন্য কোন করমুক্ত সীমা প্রযোজ্য তা নিচের ছকে দেখানো হলো:

করদাতার শ্রেণীকরমুক্ত আয়ের সীমা (বার্ষিক)
সাধারণ ব্যক্তি (পুরুষ)৩,৫০,০০০ টাকা
মহিলা করদাতা৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তি৪,০০,০০০ টাকা
তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি৪,৭৫,০০০ টাকা
গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা৫,০০,০০০ টাকা

শূন্য আয়কর জমা দেওয়ার প্রধান শর্তাবলী

শূন্য আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য কয়েকটি মূল শর্ত মানতে হবে:

  1. ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (TIN) থাকা
  • যেকোনো ব্যক্তি যদি শূন্য আয়কর দাখিল করতে চান, তার অবশ্যই একটি বৈধ টিআইএন থাকতে হবে।
  • টিআইএন হচ্ছে সরকারের কাছে আপনার একক পরিচয়, যা আয়কর সম্পর্কিত সকল কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করা হয়।
  1. মোট আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকা
  • ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারধারীর আয় যদি সরকারের নির্ধারিত করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকে, তখন তিনি শূন্য আয়কর জমা দিতে পারেন।
  • উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ব্যক্তি বছরে সরকার নির্ধারিত করমুক্ত সীমার চেয়ে কম আয় করেন, তার আয়কর দায় হবে না।
  1. বাধ্যতামূলক দাখিল
  • আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও, প্রতিটি টিআইএন ধারীর জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক।
  • যদি কোনো ব্যক্তি আয় না করেও রিটার্ন দাখিল না করেন, তা আইনগতভাবে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

আয়কর জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা

শূন্য আয়কর জমা দেওয়া শুধু আইনগত দিক থেকে নয়, ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এর কিছু কারণ হলো:

  • আইন মেনে চলার প্রমাণ: সরকার আপনার আয়ের সঠিক তথ্য পায় এবং এটি আপনার আইন মেনে চলার প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
  • ভবিষ্যতের কর নির্ধারণে সুবিধা: শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আয় বা সম্পদ বৃদ্ধির সময় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
  • ঋণ বা ব্যাংক লেনদেনে সুবিধা: অনেক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আয়কর রিটার্নের ভিত্তিতে ঋণ বা ক্রেডিট দেয়। শূন্য আয়কর রিটার্নও প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
  • কোনও বিতর্ক বা জটিলতা এড়ানো: আয়কর দাখিল না করলে ভবিষ্যতে কর সংক্রান্ত বিতর্ক বা জরিমানা হতে পারে।

ধাপে ধাপে অনলাইনে শূন্য আয়কর জমা দেওয়ার পদ্ধতি

১. ট্যাক্স কমিশনরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লগইন করুন

প্রথমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লগইন করতে হবে।

  • লগইন করার জন্য আপনার TIN এবং পাসওয়ার্ড প্রয়োজন।
  • যদি আপনি নতুন ব্যবহারকারী হন, তবে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

২. আয়কর রিটার্ন ফরম নির্বাচন

  • লগইন করার পর Income Tax Return ফরম নির্বাচন করুন।
  • এখানে আপনি শূন্য আয়কর জমা দেওয়ার জন্য Zero Return বা শূন্য রিটার্ন অপশনটি নির্বাচন করবেন।

৩. ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই

  • ফরমে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য যেমন নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, ইমেইল ঠিকানা ইত্যাদি যাচাই করুন।
  • নিশ্চিত করুন যে তথ্যটি TIN-এর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

৪. আয় সংক্রান্ত তথ্য প্রদান

  • শূন্য আয়কর রিটার্নের ক্ষেত্রে, আয়কর দায় শূন্য হওয়ায় আয়ের তথ্য সীমিত।
  • এখানে আপনার মোট আয়করমুক্ত আয় এবং কোনো আয়করযোগ্য আয় থাকলে তা উল্লেখ করতে হবে।
  • যদি আপনার কোনো আয় না থাকে, তবে 0 লিখে দিতে হবে।

৫. রিটার্ন জমা দেওয়া

  • সব তথ্য যাচাই করার পর Submit বাটনে ক্লিক করুন।
  • সফলভাবে জমা দেওয়ার পরে একটি Acknowledgment Receipt বা জমা দেওয়ার প্রমাণ পাবেন।
  • এটি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে।

অনলাইনে শূন্য আয়কর জমা দেওয়ার সুবিধা

অনলাইনে শূন্য আয়কর জমা দেওয়া অনেক সুবিধা প্রদান করে, যেমন:

  1. সহজ ও দ্রুত: ঘরে বসেই কয়েক মিনিটে রিটার্ন জমা দেওয়া যায়।
  2. ভুল কম: ডিজিটাল ফরম পূরণের কারণে ভুলের সম্ভাবনা কম থাকে।
  3. স্বয়ংক্রিয় যাচাই: অনলাইনে জমা দেওয়া হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
  4. নিরাপদ: কাগজপত্র সংরক্ষণ এবং হারানোর ঝুঁকি কম থাকে।
  5. পরিবেশবান্ধব: কাগজ ব্যবহার কম হওয়ায় পরিবেশের প্রতি ইতিবাচক প্রভাব।

Zero Return জমার পর করপত্র সংরক্ষণ

শূন্য আয়কর রিটার্ন জমার পর প্রাপ্ত Acknowledgment Receipt সংরক্ষণ করা আবশ্যক।

  • এটি ভবিষ্যতে ব্যাংক লোন, ভিসা আবেদন বা যেকোনো সরকারী দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • অনলাইনে জমা দেওয়ার পর প্রিন্ট আউট করে নিজের রেকর্ডে রাখুন।
  • ডিজিটাল কপি ইমেইলে সংরক্ষণ করা আরও সুবিধাজনক।

শূন্য আয়কর জমা দেওয়ার সময়সীমা

প্রতি অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে।

  • সাধারণত, অর্থবছর শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
  • নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা বা অন্যান্য আইনগত জটিলতা হতে পারে।
  • তাই সময়মতো শূন্য আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণ ভুল এবং সতর্কতা

অনলাইনে Zero Return জমা দেওয়ার সময় কিছু সাধারণ ভুল এড়ানো জরুরি:

  1. TIN তথ্য ভুল: TIN নম্বর বা ব্যক্তিগত তথ্য ভুল হলে রিটার্ন গ্রহণযোগ্য হবে না।
  2. আয় তথ্য অসম্পূর্ণ: যদিও আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকলেও আয় তথ্য সম্পূর্ণভাবে দিতে হবে।
  3. Acknowledgment Receipt হারানো: জমা দেওয়ার প্রমাণ সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে।
  4. সময়সীমা অতিক্রম: সময়সীমার পর জমা দিলে জরিমানা বা আইনি জটিলতা হতে পারে।
    শূন্য আয়কর বা Zero Return হলো এমন একটি রিটার্ন যেখানে আয়কর দায় শূন্য থাকে। এটি আইনগত বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য জমা দিতে হয়। বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সরকারের কাছে আয়-ব্যয়ের সঠিক তথ্য প্রদান করে এবং ভবিষ্যতে আইনগত নিরাপত্তা দেয়।
    অনলাইনে শূন্য আয়কর জমা দেওয়া সহজ, দ্রুত এবং নিরাপদ। টিআইএন থাকা, আয়করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়াই মূল শর্ত। সঠিকভাবে শূন্য আয়কর জমা দিয়ে নাগরিকরা তাদের আইনগত দায়বদ্ধতা পূরণ করতে পারেন।

Leave a Comment