শিক্ষা ক্যাডার বদলি বিতর্ক: নীতিমালা লঙ্ঘন ও নির্বাচনকালীন প্রশ্ন

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের প্রায় ৫০০ কর্মকর্তার গণবদলি নিয়ে সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর একযোগে শতাধিক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার বদলি নিয়ে প্রশাসনে তীব্র আলোচনা

বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনে সাম্প্রতিক সময়ে যে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা হলো বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাসে অন্যতম বড় গণবদলি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। হঠাৎ ও ব্যাপক এই বদলি শুধু প্রশাসনিক অঙ্গনে নয়, বরং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহল, নির্বাচন বিশ্লেষক এবং সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যেও তীব্র প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

এই বদলিকে ঘিরে নীতিমালা লঙ্ঘন, ক্ষমতাশালী সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে এমন সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার পরিপন্থী কি না—সে প্রশ্নও জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

ইতিহাসের অন্যতম বড় বদলি, প্রশ্নের মুখে শিক্ষা প্রশাসন

শিক্ষা ক্যাডারে একসঙ্গে প্রায় ৫০০ কর্মকর্তার বদলি আগে কখনো দেখা যায়নি বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ মাত্র চার থেকে নয় মাস আগে নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগ দিয়েছিলেন। অথচ বিদ্যমান বদলি নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—একই কর্মস্থলে ন্যূনতম দুই বছর পূর্ণ না হলে বদলির আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়।

এই বাস্তবতায় নীতিমালা উপেক্ষা করে এমন গণবদলি কীভাবে সম্ভব হলো, তা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত একটি প্রভাবশালী চক্র।

আরও পড়ুনঃ রাবিতে ৬ অনুষদের দায়িত্ব নিলেন উপাচার্য ও দুই উপ-উপাচার্য

বদলি নীতিমালার সুস্পষ্ট ব্যত্যয়

শিক্ষা ক্যাডার বদলি নীতিমালার ৪.৩ (খ) ধারায় বলা হয়েছে—

“শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা একই কর্মস্থলে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে অন্যত্র বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন না।”

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বহু কর্মকর্তা মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একাধিকবার বদলির শিকার হয়েছেন। নীতিমালার এই সরাসরি লঙ্ঘন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালা লঙ্ঘনের এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও পেশাগত নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

নির্বাচনকালীন সময়ে বদলি: কতটা যুক্তিসংগত?

তফসিল ঘোষণার পরপরই এ ধরনের গণবদলি নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ বড় আকারের বদলি মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং পরোক্ষভাবে নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাদের আশঙ্কা, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা যেহেতু স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও সমাজে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব, তাই এই বদলি নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলির ফাইল জমে ছিল। প্রশাসনিক ও অন্যান্য জটিলতার কারণে এসব ফাইলে সময়মতো স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। তফসিল ঘোষণার রাতে জমা থাকা ফাইলগুলো একযোগে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের স্বাক্ষরেই এসব বদলি কার্যকর হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ফাইল আটকে থাকার যুক্তি দিলেও নীতিমালার ব্যত্যয় ও নির্বাচনকালীন সময় বেছে নেওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যার বাইরে থেকেই যাচ্ছে।

সিন্ডিকেট ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী বদলি সিন্ডিকেটকে ঘিরে। অনুসন্ধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ডিআইএ-র একাধিক কর্মকর্তার নাম সামনে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে—

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুইজন যুগ্মসচিব
  • একজন প্রভাবশালী উপসচিব
  • মাউশির একজন পরিচালক
  • শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের শীর্ষ এক কর্মকর্তা
  • ডিআইএ-র একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা

এই সমন্বিত চক্রের মাধ্যমেই ‘ভালো’ ও কাঙ্ক্ষিত পদায়ন নির্ধারিত হয়। আর্থিক লেনদেন ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে বদলি ঠেকানো বা পছন্দের স্থানে পদায়ন পাওয়া সম্ভব হয় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

বদলি আদেশ সংশোধন: সন্দেহ আরও ঘনীভূত

গণবদলির মাত্র দশ দিনের মাথায় পাঁচটি পৃথক প্রজ্ঞাপনে বদলি আদেশ সংশোধন করা হয়। এতে দেখা যায়, ঢাকার বাইরে বদলি হওয়া অনেক কর্মকর্তাকে পুনরায় ঢাকায় পদায়ন করা হয়েছে।

এই সংশোধনীকে অনেকেই ‘ম্যানেজমেন্টের’ প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাঁরা সিন্ডিকেটকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছেন, তাঁরাই বদলি আদেশ সংশোধনের সুবিধা পেয়েছেন।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্ভোগ

হঠাৎ ও ঘন ঘন বদলির কারণে চরম মানবিক সংকটে পড়েছেন অনেক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা। কেউ নতুন বাসা ভাড়া নিয়েছেন, কেউ সন্তানদের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন—এর মধ্যেই আবার বদলির নির্দেশ।

একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“চার মাস আগে ঢাকায় বদলি হয়ে সংসার গুছিয়েছি। এখন আবার নতুন জায়গায় যেতে বলা হচ্ছে। পরিবার নিয়ে নতুন করে শুরু করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।”

শিক্ষাবিদদের মতে, এই অস্থিরতা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রমেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব বুঝে ওঠার আগেই বদলি হলে পাঠদান, প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের অনিয়মিত বদলি শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নষ্ট করছে। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার বদলির ফলে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়।

একই সঙ্গে প্রশাসনের প্রতি কর্মকর্তাদের আস্থা কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।

নীরবতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আববার ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্তাদের এই নীরবতা বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে।

শিক্ষা ক্যাডারের এই নজিরবিহীন গণবদলি কেবল একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নীতিনিষ্ঠা ও জবাবদিহিতার একটি বড় পরীক্ষাও বটে। নীতিমালা লঙ্ঘন, সিন্ডিকেটের অভিযোগ, নির্বাচনকালীন সময় বেছে নেওয়া এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্ভোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত একটি স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত না হলে শিক্ষা প্রশাসনের প্রতি আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর।

Leave a Comment