
চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং ধাপ হলো ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষা। অনেক প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও ভাইভা বোর্ডে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ জ্ঞানের ঘাটতি নয়; বরং আত্মবিশ্বাসের অভাব, প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে অপ্রস্তুতি, ভাষাগত দুর্বলতা এবং মানসিক চাপ।
বিশেষ করে যারা প্রথমবার ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হন, তাদের ক্ষেত্রে উদ্বেগ ও নার্ভাসনেস একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে অভিজ্ঞ নিয়োগকর্তা ও এইচআর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইভা বোর্ডে প্রশ্ন যতটা না কঠিন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো উত্তর দেওয়ার ভঙ্গি, মনোভাব ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ।
এই প্রতিবেদনে ভাইভা বোর্ডে ঘুরেফিরে যেসব প্রশ্ন প্রায় সব চাকরির সাক্ষাৎকারেই করা হয়, সেগুলো বিশ্লেষণসহ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে বোর্ড কী যাচাই করতে চায়, সেটিও ব্যাখ্যা করা হয়েছে—যাতে চাকরিপ্রার্থীরা আগেভাগেই সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারেন।
আরও পড়ুনঃ সিটি গ্রুপে অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ নিয়োগ ২০২৫
ভাইভা বোর্ডে কেন কিছু প্রশ্ন বারবার আসে?
নিয়োগ বোর্ড সাধারণত ভাইভার মাধ্যমে প্রার্থীর—
- ব্যক্তিত্ব
- যোগাযোগ দক্ষতা
- আত্মবিশ্বাস
- বাস্তব অভিজ্ঞতা
- সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা
- পেশাগত মনোভাব
- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এই বিষয়গুলো যাচাই করে থাকে। সে কারণেই নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন প্রায় সব ভাইভা বোর্ডেই কমন হয়ে ওঠে।
ভাইভা বোর্ডে প্রায়ই জিজ্ঞাসিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নসমূহ
১. আপনার নাম কী এবং নামের অর্থ কী?
এই প্রশ্নের মাধ্যমে বোর্ড প্রার্থীর আত্মপরিচয় ও কথা বলার স্বাচ্ছন্দ্য যাচাই করে। অনেক সময় একই নামের কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির উদাহরণ চাওয়া হয়, যা প্রার্থীর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দেয়।
২. আপনি কোন জেলার বাসিন্দা? জেলাটি কী কারণে পরিচিত?
নিজের জেলা সম্পর্কে জানা মানে নিজের শিকড় সম্পর্কে সচেতন থাকা। জেলার ইতিহাস, অর্থনীতি বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে পারলে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
৩. আপনার শখ কী?
শখের প্রশ্নের মাধ্যমে বোর্ড জানতে চায় প্রার্থী অবসর সময়ে কীভাবে নিজেকে গড়ে তোলে এবং তার ব্যক্তিত্ব কতটা ভারসাম্যপূর্ণ।
৪. নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন
ভাইভা বোর্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। এখানে প্রার্থীর শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন সংক্ষেপে তুলে ধরতে হয়।
৫. এই চাকরির খবর কীভাবে জানলেন?
এই প্রশ্ন থেকে বোর্ড প্রার্থীর সচেতনতা, চাকরি অনুসন্ধানের কৌশল এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ মূল্যায়ন করে।
৬. আপনি কেমন কাজের পরিবেশ পছন্দ করেন?
টিমওয়ার্ক, শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
৭. হার্ড ওয়ার্ক ও স্মার্ট ওয়ার্ক কী?
এই প্রশ্নে প্রার্থীর কাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সময় ব্যবস্থাপনার ধারণা বোঝা যায়।
৮. চাপের মধ্যে কাজ করা বলতে কী বোঝেন?
চাকরির বাস্তব পরিবেশে চাপ সামাল দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি আছে কি না, সেটিই এখানে যাচাই হয়।
৯. আপনি নিজে সমাধান করেছেন—এমন কোনো সমস্যার উদাহরণ দিন
এটি প্রার্থীর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে।
১০. নিজের দক্ষতা উন্নয়নে কী করেন?
শেখার আগ্রহ ও আত্মউন্নয়নের মানসিকতা বোর্ডের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১১. পূর্ববর্তী চাকরির অভিজ্ঞতা
কোথায় কাজ করেছেন, কী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কেন চাকরি ছেড়েছেন—এসব প্রশ্নে সততা ও পেশাদারিত্ব যাচাই হয়।
১২. একা কাজ না দলগত কাজ—কোনটি পছন্দ?
এখানে প্রার্থীর সহযোগিতামূলক মানসিকতা বোঝা হয়।
১৩. Strength, Weakness, Opportunity, Threat (SWOT)
নিজের শক্তি ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা বোঝার জন্য এই প্রশ্নটি করা হয়।
১৪. বস ও সহকর্মীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা
মানুষের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা এবং আচরণগত পরিপক্বতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
১৫. চাপের সময় কীভাবে নিজেকে সামলান?
মানসিক স্থিরতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যাচাই করা হয়।
১৬. আমাদের প্রতিষ্ঠানেই কেন কাজ করতে চান?
প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আগ্রহ ও গবেষণার প্রমাণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
১৭. কতদিন আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চান?
এই প্রশ্নে প্রার্থীর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বোঝা যায়।
১৮. সময়ানুবর্তিতা সম্পর্কে আপনার মতামত
পেশাদারিত্বের একটি মৌলিক দিক হলো সময় ব্যবস্থাপনা।
১৯. আপনার কোনো সৃজনশীল কাজের উদাহরণ দিন
সৃজনশীল চিন্তা ও নতুন ধারণা দেওয়ার ক্ষমতা যাচাই করা হয়।
২০. দলগত কাজের গুরুত্ব কতটা?
এই প্রশ্নের মাধ্যমে নেতৃত্ব ও সহযোগিতার মানসিকতা বোঝা যায়।
২১. আপনাকে নিয়োগ দিলে কী পরিবর্তন আনতে পারবেন?
প্রার্থী প্রতিষ্ঠানে কী মূল্য সংযোজন করতে পারবে, সেটিই এখানে মূল বিষয়।
২২. দশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
দূরদর্শিতা ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটে এই উত্তরে।
২৩. আপনার কোনো পরামর্শ বাস্তবায়িত হয়েছে—এমন উদাহরণ দিন
এই প্রশ্নে প্রার্থীর প্রভাব বিস্তার ও উদ্যোগী মনোভাব বোঝা যায়।
২৪. নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেন?
ডিজিটাল দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সচেতনতা আজকের চাকরির বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২৫. আপনার বেতন প্রত্যাশা কত?
বাস্তবতা ও আত্মমূল্যায়নের সক্ষমতা যাচাই করা হয় এই প্রশ্নে।
আরও পড়ুনঃ যমুনা গ্রুপে প্লাজা ম্যানেজার নিয়োগ ২০২৫ | ৩০ পদে চাকরির সুযোগ
ভাইভায় সফল হওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
- মুখস্থ উত্তর নয়, স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত উত্তর দিন
- চোখে চোখ রেখে কথা বলুন
- প্রশ্ন বুঝে উত্তর দিন, অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলুন
- নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক কিন্তু অতিরঞ্জনহীন থাকুন
- প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আগেভাগে গবেষণা করুন
ভাইভা বোর্ড কোনো ভয় পাওয়ার জায়গা নয়; বরং এটি নিজেকে উপস্থাপনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। সঠিক প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস এবং প্রশ্নগুলোর পেছনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারলে ভাইভা সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অভিজ্ঞদের মতে, এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রশ্নগুলো ভালোভাবে অনুশীলন করলে যে কোনো চাকরির ভাইভায় সাফল্যের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।