কেরালিন দিলেই কি পানি জীবাণুমুক্ত হয়? জানুন আসল সত্য!

কেরালিন পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং পানি পরিশোধন করার নিয়ম।
বন্যা বা দুর্যোগে পানি জীবাণুমুক্ত করতে কেরালিন ট্যাবলেট ব্যবহারের নিয়ম ও এর কার্যকারিতা।

কেরালিন দিলেই কি পানি জীবাণুমুক্ত হয়? আসল সত্য অনেকেই জানেন না

বন্যার সময় বা গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশে সরকার প্রায়ই পানি পরিশোধন ট্যাবলেট, যেটি কেরালিন নামে বেশি পরিচিত, বিতরণ করে। অনেকে মনে করেন কেরালিন দিলেই পানি পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে যায়। বাস্তবটা কিছুটা জটিল।

কেরালিন কীভাবে কাজ করে

পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটে সাধারণত ক্লোরিন, ক্লোরিন ডাই-অক্সাইড অথবা আয়োডিন থাকে। এই রাসায়নিকগুলো পানিতে থাকা ক্ষতিকর অণুজীবদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। কলেরা, টাইফয়েড বা ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে এটি কার্যকর। বিশেষত বন্যার পরে বা দুর্যোগ পরিস্থিতিতে এটি দ্রুত ও সহজলভ্য সমাধান।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, পাঁচ লিটার পানি সুতি কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিয়ে তাতে একটি ট্যাবলেট ভালোভাবে মিশিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করার পর পান করা যাবে।

আরও পড়ুনঃ ভাইভা বোর্ড প্রশ্ন: চাকরির ভাইভায় যে ২৫টি প্রশ্ন প্রায়ই করা হয়

কিন্তু যেখানে কেরালিন কাজ করে না

সমস্যাটা শুরু হয় এখানে। কেরালিন বা যেকোনো পানি পরিশোধন ট্যাবলেট শুধু অণুজীব নিষ্ক্রিয় করার জন্য তৈরি। কীটনাশক, ভারী ধাতু বা অন্যান্য রাসায়নিক দূষণ এই ট্যাবলেটে দূর হয় না। 

ট্যাবলেটগুলো ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকর। তবে এগুলো পানি থেকে রাসায়নিক দূষণ বা ভারী ধাতু দূর করে না।

বাংলাদেশে এটা বড় সমস্যা কারণ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক, সীসা, ম্যাঙ্গানিজের মতো ভারী ধাতু পাওয়া যায়। কেরালিন দিলে এই দূষণকারী ভারী ধাতু পানিতেই থেকে যায়।

পানি ঘোলা হলে কেরালিনের কার্যকারিতা কমে

আরেকটা সমস্যা হলো পানি ঘোলা বা মাটিমিশ্রিত হলে কেরালিনের কার্যকারিতা কমে যায়। পানির কণাগুলো ক্লোরিনের সাথে বিক্রিয়া করে এবং ক্লোরিনের একটা অংশ জীবাণু মারার পরিবর্তে অন্য কাজে ব্যয় হয়ে যায়। এজন্যই সরকারি নির্দেশনায় আগে পানি কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিতে বলা হয়, তারপর ট্যাবলেট দিতে বলা হয়।

পানি পরিশোধন ট্যাবলেট কণা, ভারী ধাতু বা বেশিরভাগ রাসায়নিক দূষণ দূর করতে পারে না। এগুলোর জন্য ফিল্টার বা এক্টিভেট কার্বন দরকার হয়।

কেরালিন কখন ব্যবহার করবেন, কখন করবেন না

বন্যা বা দুর্যোগে যখন বিকল্প নেই, তখন কেরালিন জীবন রক্ষাকারী। পানিবাহিত জীবাণু রোগের ঝুঁকি থাকলে এটা ব্যবহার করাই উচিত।

কিন্তু রোজকার পানীয় হিসেবে শুধু কেরালিনের উপর নির্ভর করা ঠিক নয়। কারণ আপনার এলাকার পানিতে আর্সেনিক বা ভারী ধাতুর সমস্যা থাকলে কেরালিন কোনো সুরক্ষা দেবে না।

তাহলে নিরাপদ পানির জন্য কী করবেন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পানির জন্য শুধু একটি পদ্ধতিতে ভরসা না রেখে সমন্বিত উপায়ে যেতে হবে।

প্রথমে এলাকার পানি পরীক্ষা করান। আর্সেনিকের সমস্যা থাকলে রিভার্স অসমোসিস (RO) ফিল্টার কার্যকর। জীবাণুর সমস্যার জন্য ফুটানো বা কেরালিন কাজে আসে। ঘোলা পানির জন্য আগে ছেঁকে নেওয়া জরুরি। বাসা-বাড়ি, অফিস কিংবা শিল্প কারখানায় নিরাপদ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের পানির ফিল্টার এখন অনলাইনে তুলনা করে দেখে কেনা যায়, এতে কোন ধরনের ফিল্টার কোন ধরনের দূষণের জন্য উপযুক্ত সেটা বুঝে নেওয়া যায়।

কেরালিন একটি গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, কিন্তু এটি পানিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করে না। পানির ধরন ও দূষণের প্রকৃতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *