
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম
শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি, দাবি না মানলে অবরোধের হুঁশিয়ারি
রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের ঘোষিত ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামকে কেন্দ্র করে। সংগঠনটির মুখপাত্র ও ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদিকে শেষ বিদায় জানাতে গিয়ে শাহবাগে জড়ো হয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের সরাসরি দাবি জানিয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সন্ধ্যার আগে দেওয়া এই ঘোষণায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়ে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দাবি পূরণ না হলে পরদিন রোববার (২১ ডিসেম্বর) বিকেল সোয়া ৫টায় পুনরায় শাহবাগ অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই আলটিমেটাম ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
শাহবাগে শোক থেকে প্রতিবাদ
শরিফ ওসমান হাদির দাফন ও জানাজা শেষে শাহবাগ এলাকায় জড়ো হন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা। শোকের আবহ ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রতিবাদী অবস্থানে। নেতারা বলেন, এটি শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
শাহবাগে দেওয়া বক্তব্যে বক্তারা বলেন, “একজন রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠনের মুখপাত্রকে প্রকাশ্যে হামলার শিকার হতে হলো, অথচ এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি—এটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা।”
আরও পড়ুনঃ এসিআই টেরিটরি ম্যানেজার নিয়োগ: আবেদন শেষ ৩১ ডিসেম্বর
২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামের ঘোষণা
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অধীনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগই একমাত্র সমাধান বলে মনে করছে সংগঠনটি।
শনিবার সন্ধ্যার আগে শাহবাগে দেওয়া ঘোষণায় বলা হয়, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ না করলে রোববার বিকেল সোয়া ৫টায় আবার শাহবাগ অবরোধ করা হবে।”
এই ঘোষণার সময় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক স্লোগান ও আবেগঘন পরিবেশ দেখা যায়। তবে একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া হয়।
সহিংসতা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, কোনো ধরনের সহিংসতায় জড়ানো যাবে না। তিনি স্পষ্ট করে জানান, ইনকিলাব মঞ্চের সব সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে জানানো হবে এবং সংগঠনের বাইরে কোনো আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার অনুরোধ করেন।
তিনি বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাস করি। সহিংসতার মাধ্যমে কোনো দাবি আদায় সম্ভব নয়। তবে ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে।”
আগেই দেওয়া হয়েছিল আরেকটি আলটিমেটাম
এর আগে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদাবক্স চৌধুরীকেও ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিল ইনকিলাব মঞ্চ। শনিবার শরিফ ওসমান হাদির জানাজার আগমুহূর্তে পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যে এই আলটিমেটামের কথা জানান আবদুল্লাহ আল জাবের।
সে সময় তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, “হাদির ওপর হামলার পর এক সপ্তাহ পার হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। জনগণের কাছে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।”
জনগণের কাছে জবাবদিহির দাবি
ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা দাবি করেন, খোদাবক্স চৌধুরীকে এক সপ্তাহে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে হবে। তাদের মতে, শুধু আশ্বাস নয়—বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায় মানুষ।
বক্তারা বলেন, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে দায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে।”
সম্পন্ন হলো শরিফ ওসমান হাদির দাফন
এদিকে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন তার পরিবার-পরিজন, সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আবেগঘন পরিবেশে শেষ বিদায় জানান তারা।
জাতীয় সংসদ ভবনে জানাজায় লাখো মানুষের ঢল
এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শহীদ শরিফ ওসমান হাদির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন লাখো মানুষ। তার বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে নামাজে জানাজা আদায় করা হয়।
জানাজা শেষে মরদেহ দাফনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় কবরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো পথজুড়ে মানুষের ঢল ও শোকের আবহ ছিল লক্ষণীয়।
রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের উপস্থিতি
শহীদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি এই মৃত্যুকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। অনেকেই এটিকে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া
এই আলটিমেটাম ও কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ ইনকিলাব মঞ্চের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ সংযম ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় এই আন্দোলন সরকার ও প্রশাসনের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের জবাবদিহি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের বিচারের আওতায় না আনলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
কী হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ
ইনকিলাব মঞ্চের ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর। আলটিমেটামের সময় শেষ হলে শাহবাগে পুনরায় অবরোধ কর্মসূচি কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষতি নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম, শাহবাগ অবরোধের হুঁশিয়ারি এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নতুন মোড় নিতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।