
দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ও স্থানীয় তেজাবি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন করে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করেছে। নতুন এই দাম আজ বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) থেকে সারা দেশে কার্যকর হচ্ছে।
বাজুসের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম একলাফে ৪ হাজার ১৯৯ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি এখন দেশের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চ দামে পৌঁছেছে।
কেন বাড়ল স্বর্ণের দাম?
বাজুস জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার-স্বর্ণের দামের ওঠানামা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ—সবকিছু মিলিয়েই এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন অনেক বিনিয়োগকারী। ফলে চাহিদা বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারদরে।
আরও পড়ুনঃ মেঘনা ব্যাংকে চাকরি নিয়োগ: ঢাকায় ইন্টারনাল অডিটর পদে আবেদন
নতুন দামে কত হলো ভরিপ্রতি স্বর্ণ?
নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে—
- ২২ ক্যারেট স্বর্ণ: প্রতি ভরি ২ লাখ ২৬ হাজার ২৮২ টাকা
- ২১ ক্যারেট স্বর্ণ: প্রতি ভরি ২ লাখ ১৬ হাজার ১৭ টাকা
- ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ: প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৫ হাজার ১৬৬ টাকা
- সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ: প্রতি ভরি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩১৫ টাকা
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতি ভরি স্বর্ণের ওজন ধরা হয়েছে ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম।
ভ্যাট ও মজুরি যোগ হলে দাম আরও বাড়বে
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নির্ধারিত স্বর্ণমূল্যের সঙ্গে ক্রেতাদের অবশ্যই সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করে পরিশোধ করতে হবে।
তবে গহনার ডিজাইন, কারুকাজ, ও মানভেদে এই মজুরি ভিন্ন হতে পারে। অর্থাৎ ভারী ডিজাইন বা বিশেষ কারিগরি কাজ থাকলে স্বর্ণালংকারের চূড়ান্ত দাম আরও বাড়তে পারে।
রুপার দামেও পরিবর্তন
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামেও নতুন সমন্বয় এনেছে বাজুস। নতুন মূল্য অনুযায়ী—
- ২১ ক্যারেট রুপা: প্রতি ভরি ৪ হাজার ৮৯৯ টাকা
- ১৮ ক্যারেট রুপা: প্রতি ভরি ৪ হাজার ১৯৯ টাকা
- সনাতন পদ্ধতির রুপা: প্রতি ভরি ৩ হাজার ১৪৯ টাকা
বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, রুপার দামও আন্তর্জাতিক বাজার ও স্থানীয় সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাধারণ ক্রেতাদের ওপর প্রভাব
নতুন এই দাম কার্যকরের ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমকে সামনে রেখে যারা স্বর্ণালংকার কেনার পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের ব্যয় আরও বাড়বে।
ঢাকার নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তানসহ দেশের বিভিন্ন স্বর্ণের বাজারে ক্রেতারা জানান, গত কয়েক মাসে স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে অনেকেই এখন স্বর্ণ কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন অথবা হালকা ও কম ওজনের গহনার দিকে ঝুঁকছেন।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়লেও বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে আগের তুলনায় বিক্রির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা এখন অনেক হিসাব-নিকাশ করে স্বর্ণ কিনছেন।
একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানান, “দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা এখন ডিজাইন নয়, ওজন কমানোর দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন।”
বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ কতটা নিরাপদ?
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ একটি নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হলেও স্বল্পমেয়াদে দাম ওঠানামা স্বাভাবিক। যারা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ কিনতে চান, তাদের উচিত বাজার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
সামনে কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি ডলারের দাম স্থিতিশীল না হয় এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা চলতে থাকে, তাহলে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে। তবে আমদানি শুল্ক, স্থানীয় বাজারে চাহিদা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্তও বড় ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন এই মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের স্বর্ণবাজার আবারও আলোচনায় এসেছে। ভরিতে ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা ছাড়ানো ২২ ক্যারেট স্বর্ণ সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালেও বাজার বাস্তবতায় এই দামই এখন কার্যকর। ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের তাই আরও সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।