আরাত্তাই: হোয়াটসঅ্যাপের বিকল্প দেশীয় অ্যাপ

আরাত্তাই অ্যাপ - ভারতীয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের বিকল্প (Arattai App - Indian messaging app alternative to WhatsApp)
ভারতে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে দেশীয় মেসেজিং অ্যাপ ‘আরাত্তাই’।

বর্তমান বিশ্বে দ্রুত যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপ। আর এই বাজারে বছরের পর বছর একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে মেটার মালিকানাধীন হোয়াটসঅ্যাপ। তবে সম্প্রতি সেই আধিপত্যে ভাগ বসাতে শুরু করেছে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অ্যাপ ‘আরাত্তাই’ (Arattai)। ভারতের জোহো করপোরেশন (Zoho Corporation) নির্মিত এই অ্যাপটি এখন দেশটির প্রযুক্তি মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

কি এই ‘আরাত্তাই’?

তামিল শব্দ ‘আরাত্তাই’-এর বাংলা অর্থ হলো ‘আলাপ-আলোচনা’ বা ‘আড্ডা’। ২০২১ সালে এটি সীমিত পরিসরে যাত্রা শুরু করলেও তখন ব্যবহারকারীদের তেমন নজরে আসেনি। তবে ভারত সরকারের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ (Self-Reliant India) স্লোগান এবং দেশীয় অ্যাপ ব্যবহারের আহ্বানে হঠাৎ করেই এর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুনঃ এসিআই লিমিটেড নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০২৬: বয়সসীমা ছাড়াই চাকরির সুযোগ

বিস্ময়কর উত্থান: মাত্র এক সপ্তাহে ৭ মিলিয়ন ডাউনলোড

মার্কেট গবেষণা সংস্থা সেন্সর টাওয়ারের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ‘আরাত্তাই’ অ্যাপটি ডাউনলোড করার হার অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে।

  • অগাস্টের পরিসংখ্যান: মাত্র ১০ হাজার ডাউনলোড।
  • সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান: মাত্র এক সপ্তাহে ৭ মিলিয়ন বা ৭০ লাখের বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে।
  • ডেইলি সাইনআপ: জোহোর সিইও মণি ভেম্বু জানিয়েছেন, আগে যেখানে দিনে ৩ হাজার মানুষ সাইনআপ করত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজারে।

আরাত্তাই অ্যাপের বিশেষ ফিচারসমূহ

হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের বিকল্প হিসেবে আরাত্তাই কেন এগিয়ে থাকছে? এর পেছনে রয়েছে কিছু ব্যবহারকারী-বান্ধব ফিচার:

  1. ভয়েস ও ভিডিও কল: উচ্চমানের অডিও ও ভিডিও কলের সুবিধা।
  2. বিজনেস টুলস: ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবসায়িক টুলস।
  3. লো-কানেক্টিভিটি পারফরম্যান্স: এটি দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগেও বেশ ভালো কাজ করে।
  4. সহজ ইন্টারফেস: যারা খুব বেশি প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন নন, তারাও সহজে এটি ব্যবহার করতে পারেন।

হোয়াটসঅ্যাপ বনাম আরাত্তাই: কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দেশীয় প্রযুক্তি

ভারতে হোয়াটসঅ্যাপের প্রায় ৫০ কোটির বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী রয়েছে। ব্যক্তিগত আলাপ থেকে শুরু করে ব্যাংকিং এবং সরকারি কাজও এখন হোয়াটসঅ্যাপে সম্পন্ন হয়। এই অবস্থায় আরাত্তাই-এর সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

  • নেটওয়ার্ক ইফেক্ট: মানুষ সাধারণত সেই অ্যাপই ব্যবহার করে যেখানে তার সব পরিচিতজন থাকে। হোয়াটসঅ্যাপের এই বিশাল নেটওয়ার্ক ভাঙা সহজ নয়।
  • ফিচার আপডেট: হোয়াটসঅ্যাপ প্রতিনিয়ত নতুন ফিচার (যেমন- পেমেন্ট গেটওয়ে, চ্যানেল) যুক্ত করছে। আরাত্তাই-কে টিকে থাকতে হলে এই গতি বজায় রাখতে হবে।

তথ্য-গোপনীয়তা ও এনক্রিপশন বিতর্ক

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো মেসেজিং অ্যাপের মূল শক্তি হলো তার নিরাপত্তা। আরাত্তাই দাবি করেছে যে, তাদের ভয়েস ও ভিডিও কলে ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’ (End-to-End Encryption) চালু রয়েছে। তবে টেক্সট মেসেজের ক্ষেত্রে এটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

জোহো করপোরেশন অবশ্য আশ্বস্ত করেছে যে, খুব শীঘ্রই তারা চ্যাটিংয়েও এনক্রিপশন যুক্ত করবে। কোম্পানিটি জোর দিয়ে বলেছে, ব্যবহারকারীর তথ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাতেই থাকবে এবং তারা কোনো থার্ড পার্টিকে তথ্য প্রদান করবে না।

ভারত সরকারের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং আরাত্তাই

ভারত সরকার গত কয়েক বছর ধরে দেশীয় স্টার্টআপ এবং সফটওয়্যার শিল্পকে উৎসাহিত করছে। বিশেষ করে চীনা অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে ভারতীয়দের মধ্যে দেশীয় অ্যাপ ব্যবহারের আগ্রহ বেড়েছে। ‘আরাত্তাই’ এই সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত বাজার দখল করতে সক্ষম হয়েছে। জোহোর সিইও শ্রীধর ভেম্বু মনে করেন, সরকারি সমর্থন এবং জনগণের দেশপ্রেমই এই অ্যাপটিকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

কেন আপনি আরাত্তাই ব্যবহার করবেন? (ইউনিক ভ্যালু)

আপনি যদি ডেটা প্রাইভেসি নিয়ে সচেতন হন এবং আপনার তথ্য কোনো বিদেশি সার্ভারে যাক তা না চান, তবে আরাত্তাই একটি চমৎকার বিকল্প। বিশেষ করে যারা কম দামের অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করেন, তাদের জন্য এটি বেশ লাইটওয়েট এবং কার্যকর।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: আরাত্তাই কি পারবে টিকে থাকতে?

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক জনপ্রিয়তা পাওয়া সহজ হলেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন। জোহো-র মতো একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ব্যাকআপ থাকায় আরাত্তাই-এর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। তবে মেটার মতো বড় বড় টেক জায়ান্টদের সাথে লড়তে হলে তাদের নিয়মিত বাগ ফিক্সিং এবং উদ্ভাবনী ফিচারের দিকে নজর দিতে হবে।

‘আরাত্তাই’ কেবল একটি অ্যাপ নয়, বরং এটি ভারতের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের একটি প্রতীক। হোয়াটসঅ্যাপের বিকল্প হিসেবে এটি কতটুকু সফল হবে তা সময় বলে দেবে। তবে এটি পরিষ্কার যে, ভারতের মানুষ এখন দেশীয় প্রযুক্তির ওপর ভরসা করতে শিখছে।

আরও পড়ুনঃ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসে নিয়োগ ২০২৬: হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি

জোহো করপোরেশনের সক্ষমতা: আরাত্তাই-এর নেপথ্য কারিগর

আরাত্তাই কেবল একটি সাধারণ অ্যাপ নয়, এর পেছনে রয়েছে ভারতের সফলতম সফটওয়্যার কোম্পানি জোহো করপোরেশন (Zoho Corporation)। জোহো বিশ্বব্যাপী ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ব্যবসায়িক সফটওয়্যার তৈরির জন্য সুপরিচিত। জোহোর সিইও শ্রীধর ভেম্বু বরাবরই ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ দর্শনে বিশ্বাসী। জোহোর বিশাল সার্ভার ইনফ্রাস্ট্রাকচার থাকায় হোয়াটসঅ্যাপের মতো কোটি কোটি ব্যবহারকারীর চাপ সামলানোর সক্ষমতা আরাত্তাই-এর রয়েছে, যা অনেক ছোট স্টার্টআপের পক্ষে সম্ভব হয় না।

ইউজার ইন্টারফেস (UI) ও কাস্টমাইজেশন

আরাত্তাই-এর ইউজার ইন্টারফেস অত্যন্ত ক্লিন এবং আধুনিক। ব্যবহারকারীরা এতে বেশ কিছু কাস্টমাইজেশন সুবিধা পাবেন:

  • ডার্ক মোড: চোখের আরামের জন্য এতে বিল্ট-ইন ডার্ক মোড সুবিধা রয়েছে।
  • অডিও এডিটিং: ভয়েস মেসেজ পাঠানোর আগে তা শোনার এবং প্রয়োজনে এডিট করার ফিচার নিয়ে কাজ করছে জোহো।
  • লো-ব্যান্ডউইথ মোড: ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে যেখানে ইন্টারনেট ধীরগতির, সেখানেও নিরবচ্ছিন্ন চ্যাটিংয়ের জন্য এই অ্যাপটি বিশেষ অপ্টিমাইজড।

ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আরাত্তাই (Arattai for Business)

হোয়াটসঅ্যাপ বিজনেস-এর সাথে পাল্লা দিতে আরাত্তাই তাদের বিজনেস টুলসগুলো সাজিয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের পণ্যের ক্যাটালগ সরাসরি চ্যাটের মাধ্যমে গ্রাহকদের দেখাতে পারবেন। এছাড়া জোহো ইনভেন্টরি বা জোহো বুকস-এর মতো জোহোর অন্যান্য ব্যবসায়িক সফটওয়্যারের সাথে আরাত্তাই-কে ইন্টিগ্রেট করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ব্যবসায়িক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

ডেটা সিকিউরিটির ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ

তথ্য পাচার বা প্রাইভেসি নিয়ে বর্তমান সময়ে ব্যবহারকারীরা অত্যন্ত সচেতন। জোহো স্পষ্ট করেছে যে:

  1. তাদের আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন নয়, বরং সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন। তাই ব্যবহারকারীর ডেটা বিক্রি করার কোনো প্রয়োজন তাদের নেই।
  2. খুব শীঘ্রই তারা ‘সেলফ-ডিস্ট্রাক্টিং মেসেজ’ (Self-destructing messages) ফিচার যুক্ত করবে, যা নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাবে।
  3. বার্তাগুলো ভারতের নিজস্ব সার্ভারে সংরক্ষিত থাকায় জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ: হোয়াটসঅ্যাপ বনাম আরাত্তাই

ফিচারহোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp)আরাত্তাই (Arattai)
মালিকানামেটা (যুক্তরাষ্ট্র)জোহো (ভারত)
এনক্রিপশনএন্ড-টু-এন্ড (ফুল)কল (ফুল), চ্যাট (প্রক্রিয়াধীন)
ডেটা স্টোরেজগ্লোবাল ক্লাউডলোকাল (ইন্ডিয়া) সার্ভার
ব্যবসায়িক টুলসউন্নতপ্রাথমিক ও বিকাশমান
ভাষা সহায়তাবৈশ্বিকভারতীয় আঞ্চলিক ভাষার ওপর গুরুত্ব

ভারতের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও ‘আরাত্তাই’

বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ডেটা বা তথ্যকে বলা হয় ‘নতুন খনিজ তেল’ (New Oil)। একটি দেশের মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য যদি অন্য দেশের সার্ভারে থাকে, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। ভারত সরকার তাই দেশীয় অ্যাপ তৈরিতে উৎসাহ দিচ্ছে। আরাত্তাই-এর সাফল্য কেবল জোহোর সাফল্য নয়, বরং এটি ভারতের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষার পথে একটি বড় পদক্ষেপ।

সূত্র: সেন্সর টাওয়ার ও জোহো করপোরেশন রিপোর্ট।

Leave a Comment