
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি যুদ্ধে নতুন উত্তেজনা যোগ হতে যাচ্ছে শনিবার। বছরের সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা — কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট — অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগামীকাল ১৩ ডিসেম্বর। সকাল ১১টা থেকে শুরু হয়ে চলবে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।
এবারের পরীক্ষায় অংশ নিতে নিবন্ধন করেছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৭০১ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে মোট আসন সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৯৩৪টি। অর্থাৎ, প্রতি আসনের বিপরীতে লড়াই করবেন প্রায় ৩৭ জন। দেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বৃহত্তম ইউনিট হওয়ায় ভর্তি-যুদ্ধ এবার আগের বছরের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে পুরো পরীক্ষাব্যবস্থার প্রস্তুতি, পরীক্ষাকেন্দ্র, নিয়মনীতির তথ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
ঢাকার ভেতরে ও বাইরে একযোগে ভর্তি পরীক্ষা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কয়েক বছর ধরে আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হচ্ছে। এবারও একই নিয়ম অনুসারে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের আরও ৭টি বিভাগীয় শহরের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এগুলো হলো—
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সিলেট)
- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (ময়মনসিংহ)
- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (রংপুর)
ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ যাত্রা, বাড়তি খরচ বা আবাসন ঝামেলা এড়াতে নিজেদের নিকটস্থ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এতে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা সহজ হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের চাপও কমেছে।
আরও পড়ুনঃ সাজিদা ফাউন্ডেশন নিয়োগ ২০২৫: ফিল্ড অফিসার পদ
উপাচার্যের কেন্দ্র পরিদর্শন
ঢাবি কর্তৃপক্ষ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নানা প্রস্তুতি নিয়েছে। জনসংযোগ দপ্তর জানিয়েছে—
পরীক্ষার দিন সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের একটি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। পুরো পরীক্ষাকালীন সময়ে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তারা।
কোন ইউনিটে কী হচ্ছে: কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান সর্বাধিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ
ঢাবির পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট (সাবেক ‘ক’) সবচেয়ে বড়, যেখানে দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী আবেদন করে থাকে। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, আইন, গণযোগাযোগ—এই সব জনপ্রিয় বিষয়গুলোই রয়েছে এই ইউনিটের আওতায়।
এবার আবেদন সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার মান, শিক্ষকদের গবেষণা অবদান, ক্যাম্পাস–সংস্কৃতি এবং চাকরির বাজারে স্নাতকদের অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।
পরীক্ষার সময়সূচি ও প্রশ্নপত্রের ধরন
আগামীকাল শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) পরীক্ষা শুরু হবে সকাল ১১টায়। শিক্ষার্থীদের অবশ্যই পরীক্ষা শুরুর কমপক্ষে ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হবে। পরীক্ষার সময় হবে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট।
এই ইউনিটে প্রশ্নপত্র হবে MCQ + লিখিত — যদিও মূল নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে কোন অংশের কত নম্বর এবং কোন বিষয় থেকে প্রশ্ন আসবে। সাধারণত—
- বাংলা
- ইংরেজি
- সাধারণ জ্ঞান
- মানবিক–বিষয়ক সমসাময়িক জ্ঞান
- যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা
এগুলো থেকেই প্রশ্ন করা হয়ে থাকে।
প্রশ্নের সংখ্যা ও নম্বর বরাদ্দ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ভর্তি নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে।
পরীক্ষার নিয়ম কঠোর, প্রযুক্তি ব্যবহারে নজরদারি সর্বোচ্চ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটসহ নানা প্রতারণা চক্র সক্রিয় থাকে। এবারও এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ অভিযান চালিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ক্যাম্পাসসহ ঢাকা ও বিভাগীয় কেন্দ্রগুলোতে—
- মোবাইল নেটওয়ার্ক মনিটরিং
- ইলেকট্রনিক ডিভাইস স্ক্যানিং
- সিসিটিভি নজরদারি
- অতিরিক্ত সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন
—এর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন, স্মার্ট ওয়াচ, ব্লুটুথ ডিভাইস বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক সামগ্রী নিয়ে হলে ঢুকতে পারবে না।
পরীক্ষার্থীদের জন্য গাইডলাইন
ঢাবির বিজ্ঞপ্তিতে পরীক্ষার্থীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও পুনরায় জানানো হয়েছে—
✔ প্রবেশপত্র এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
অনলাইন অ্যাডমিট কার্ডের প্রিন্ট কপি এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সঙ্গে রাখতে হবে।
✔ নির্দিষ্ট কেন্দ্রে যাওয়া
যে কেন্দ্র উল্লেখ করা রয়েছে, শুধুমাত্র সেখানেই পরীক্ষা দিতে পারবেন। কেন্দ্র পরিবর্তন করা যাবে না।
✔ আগে পৌঁছানো
ভিড় ও যানজট বিবেচনায় সময়ের আগেই বেরিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
✔ কোনো অনিয়মে শাস্তি
চিটিং, ডিভাইস ব্যবহার, প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততা—কোনো কিছুই প্রমাণিত হলে ভর্তি বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা হলে কী সুবিধা পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা?
ঢাবির বাইরে বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা আয়োজনের মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত–সংক্রান্ত ঝামেলা থেকে মুক্ত হচ্ছেন। আগে যেখানে ঢাকায় একসঙ্গে এত শিক্ষার্থী আসায়—
- আবাসন সংকট
- অতিরিক্ত খরচ
- ব্যাপক যানজট
- অভিভাবকদের ভোগান্তি
সবকিছু মিলিয়ে চাপ সৃষ্টি হতো; এখন কেন্দ্রভাগ করার ফলে এই ঝামেলা অনেকটাই কমে গেছে।
তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ। বৃহৎ স্কেলে প্রশ্নপত্র পরিবহন, কেন্দ্র পরিচালনা, নকল প্রতিরোধ, সিকিউরিটি ইত্যাদি সামলাতে প্রচুর সমন্বয় প্রয়োজন। ঢাবি প্রশাসন জানায়—সব কেন্দ্রেই সমমানের নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও দেশের উচ্চশিক্ষার প্রথম পছন্দ। একাডেমিক মান, গবেষণা সুযোগ, চাকরি বাজারে দক্ষতা ইত্যাদির কারণে ঢাবির ভর্তি প্রতিযোগিতা সর্বোচ্চ।
তারা মনে করেন—
- প্রতি বছর আবেদনকারী সংখ্যা বাড়ছে
- গ্রেড–ইনফ্লেশন এবং উচ্চ–সরকারি চাকরির প্রস্তুতির কারণে মানবিক বিভাগে আকর্ষণ বাড়ছে
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও গবেষণা বাজেট বৃদ্ধি শিক্ষার্থীদের আস্থা বাড়িয়েছে
ফলে ভর্তি প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।
পরীক্ষার দিন পরিবহন–নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা
ঢাকা ও বিভিন্ন বিভাগের শহরগুলোতে পরীক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য—
- গণপরিবহনে অতিরিক্ত বাস
- ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ টিম
- ক্যাম্পাসে স্বেচ্ছাসেবক টিম
- মেডিকেল টিম ও জরুরি সেবা ডেস্ক
—সক্রিয় থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, পরীক্ষার্থীদের কেউ যাতে অসুস্থ বোধ করলে বা কোনো জরুরি সমস্যায় পড়লে দ্রুত সহায়তা পাওয়া যায়, সে জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ভর্তি পরীক্ষা শেষে কী হবে?
সাধারণত ঢাবির বিভিন্ন ইউনিটের ভর্তি–ফল দ্রুত প্রকাশ করা হয়। এই ইউনিটের পরীক্ষার ফল আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। ফল প্রকাশের পর বিভাগভিত্তিক পছন্দ তালিকা গ্রহণ, সাক্ষাৎকার, নম্বর ভেরিফিকেশন, এবং ভর্তি সম্পন্ন করার ধাপগুলো শুরু হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যাশা—এবার ভর্তি–প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দ্রুত এবং ঝামেলামুক্তভাবে সম্পন্ন হবে।
দেশের সবচেয়ে বড় ভর্তি যুদ্ধে উত্তেজনা চরমে
ঢাবির ভর্তি পরীক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী–জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশেষ করে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট—যেখানে শিক্ষার্থীরা দেশের নীতি–নির্ধারক, প্রশাসক, গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক এবং নানা পেশার নেতৃত্ব গঠন করে।
তাই এই ইউনিটে ভর্তির প্রতিযোগিতা বাড়তি গুরুত্ব বহন করে। পরীক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। পরিবার–ভিত্তিক উদ্বেগ, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ভরপুর—সব মিলিয়ে ঢাবির ভর্তি মৌসুমে উত্তেজনা সর্বদা শীর্ষে থাকে।
আগামীকাল পরীক্ষা শেষে সারা দেশের ভর্তিচ্ছুদের অপেক্ষা এখন শুধু ফল প্রকাশ এবং কাঙ্ক্ষিত বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার দিকে।