
শিক্ষা খাতে বড় সংস্কারের ইঙ্গিত, মতামত চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়
দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের পথে এগোচ্ছে সরকার। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর খসড়া প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রকাশিত খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি তিন বছর অন্তর দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং প্রকাশ করা হবে, যা হবে মানদণ্ডভিত্তিক ও জনসম্মুখে উন্মুক্ত।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে এই খসড়া অধ্যাদেশ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে অধ্যাদেশটির ওপর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত জানাতে ৩০ কার্যদিবস সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা প্রশাসন মনে করছে, এই কমিশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুনঃ কারিগরি শিক্ষক এমপিও জটিলতা
তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং: কীভাবে হবে মূল্যায়ন
খসড়া অধ্যাদেশের কমিশনের কার্যাবলি সংক্রান্ত অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং নির্ধারণের জন্য উপযুক্ত ও যুগোপযোগী মানদণ্ড নিরূপণ করবে বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন। নির্ধারিত সেই মানদণ্ডের ভিত্তিতেই প্রতি তিন বছর অন্তর সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং চূড়ান্ত করা হবে।
এই র্যাংকিং শুধু প্রশাসনিক নথিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে, যাতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি উচ্চশিক্ষা খাতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও সক্রিয় হতে বাধ্য করবে।
পিছিয়ে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ তদারকি
র্যাংকিং তালিকায় নিম্ন অবস্থানে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ তদারকির আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে খসড়া অধ্যাদেশে। কমিশন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও গবেষণা কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে।
এ ক্ষেত্রে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং মানোন্নয়নের জন্য পরামর্শ, তদারকি ও সহায়তামূলক কর্মসূচি গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। ফলে পিছিয়ে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে মানোন্নয়নের সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে সহযোগিতা
খসড়া অধ্যাদেশে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে দেশের উচ্চশিক্ষাকে সংযুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে স্থানপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রম ও কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোর্স কারিকুলাম প্রণয়নে কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহযোগিতা করবে।
এ ছাড়া আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময় কর্মসূচি এবং গবেষক আদান–প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণেও কমিশনের ভূমিকা থাকবে। প্রয়োজনে কমিশন নিজ উদ্যোগে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবে।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়বে এবং বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও দৃঢ় হবে।
শিক্ষক–শিক্ষার্থীর স্বার্থ রক্ষায় কমিশনের দায়িত্ব
খসড়া অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও কল্যাণ বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় চাহিদা নিরূপণ করবে কমিশন। এর মাধ্যমে একদিকে শিক্ষার মানোন্নয়ন, অন্যদিকে গবেষণার পরিবেশ উন্নত করার পথ তৈরি হবে।
উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে কমিশন প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং নীতিমালা প্রণয়ন করবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক চাহিদা নিরূপণ করে উপযুক্ত বাজেট প্রস্তাব তৈরির বিষয়টিও কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উদ্যোগ
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতার অভাব ও জবাবদিহিতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। নতুন খসড়া অধ্যাদেশে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কমিশন নিয়মিত তদারকি করবে, যাতে অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের জন্য বাস্তবায়নাধীন দেশি ও বিদেশি গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমও কমিশন পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করবে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও গবেষণা প্রকল্পের মূল্যায়ন
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সব ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক পরীক্ষা, নিরীক্ষা ও মূল্যায়নের আওতায় থাকবে। এর ফলে প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একটি কেন্দ্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতাও কমিশন পাবে। শিক্ষা খাতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কমিশনের ভূমিকা
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে উচ্চশিক্ষা কমিশন। একই সঙ্গে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ, অনুষদ, ইনস্টিটিউট, প্রোগ্রাম বা কোর্স চালুর ক্ষেত্রে ন্যূনতম শর্ত নির্ধারণের দায়িত্বও কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
যোগ্যতা ও উপযুক্ততার ভিত্তিতে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্তও কমিশন গ্রহণ করবে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ জারি করতে পারবে।
কমিশনের কাঠামো ও সদস্যসংখ্যা
প্রকাশিত খসড়া অধ্যাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত চিঠিতে কমিশনের কাঠামো সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠিত হবে একজন চেয়ারম্যান, আটজন কমিশনার এবং দশজন খণ্ডকালীন সদস্য নিয়ে।
চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। কমিশনের এই কাঠামো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মতামত আহ্বান: সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণ জরুরি
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খসড়া অধ্যাদেশের ওপর আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত পাঠাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মতামত প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে কমিশনটি বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর রূপ পাবে।
সার্বিক মূল্যায়ন
বিশ্লেষকদের মতে, তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং চালু করা উচ্চশিক্ষা খাতে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এটি একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াবে, অন্যদিকে মানোন্নয়নে চাপ সৃষ্টি করবে।
যদি প্রস্তাবিত বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন পূর্ণ ক্ষমতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, তাহলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে। এখন দেখার বিষয়, খসড়া অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত রূপে কতটা কার্যকর ও বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়